কানাডার দূর উত্তরের ছোট শহর চার্চিল দীর্ঘদিন ধরে আর্কটিক অঞ্চলে দেশের উপস্থিতির প্রতীক। শীতল যুদ্ধ–যুগের সামরিক অবকাঠামো, একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দর ও দক্ষিণের সঙ্গে একমাত্র রেলসংযোগ—সব মিলিয়ে এই শহর নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। আর্কটিক অঞ্চলে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ায় কানাডা আবারও তার সার্বভৌমত্ব জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগোচ্ছে।
চার্চিলের কৌশলগত গুরুত্ব
চার্চিল, ম্যানিটোবা—হাডসন বে–এর পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত এই শহরেই রয়েছে কানাডার একমাত্র আর্কটিক গভীর সমুদ্রবন্দর এবং দেশের উত্তরের দিকে যাওয়া একমাত্র রেললাইন। শহরের বিমানবন্দরটিতেও অবতরণ করতে পারে বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক ও বাণিজ্যিক বিমান।
কিন্তু বছরের পর বছর অবহেলা, অতীত সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চার্চিলের বন্দর ও রেললাইন—দেশের প্রধান আর্কটিক অবকাঠামোর দুটি অংশ—এখন মারাত্মক ক্ষতির মুখে।
শহরের মেয়র মাইক স্পেন্স বলেন, “কানাডা তার আর্কটিক সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে চায়, আর আমরা স্বাভাবিকভাবেই সেই ভূমিকা রাখতে পারি। অন্তত ভিত্তিটুকু এখানে আছে।”
নতুন মালিকানায় সংস্কারের শুরু হলেও চিরহিমায়িত মাটি গলে যাওয়ায় রেললাইন বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতএব, বড়সড় উন্নয়ন ছাড়া চার্চিলকে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রস্তুত করা কঠিন।
কানাডার উত্তরের সীমাবদ্ধতা
বিশ্বে রাশিয়ার পর কানাডারই সবচেয়ে বড় আর্কটিক এলাকা রয়েছে। কিন্তু কানাডার দূর উত্তরে বসবাসকারী ইনুইট জনগোষ্ঠীর ছোট ছোট বসতি ছাড়া বড় কোনো শহর নেই। পাকা রাস্তা ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎব্যবস্থাও অনেক জায়গায় অনুপস্থিত। আর্কটিক মহাসাগরে যাওয়ার প্রথম সর্ব-মৌসুমি সড়কটি তৈরি হয়েছে মাত্র এক দশক আগে।

ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ ও অধিগ্রহণের হুমকিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নতুনভাবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আর্কটিকে বিনিয়োগ বাড়ানোর ঘোষণা দেন।
পোর্ট অব চার্চিল প্লাস: কানাডার নতুন পরিকল্পনা
চার্চিল এখন বেশি পরিচিত মেরু ভালুক পর্যটনের জন্য। তবে ফেডারেল সরকারের নতুন পরিকল্পনা—‘পোর্ট অব চার্চিল প্লাস’—এ শহরকে বাণিজ্যিক ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে।
এতে অন্তর্ভুক্ত:
• সারা বছরের সড়ক নির্মাণ
• বরফভেদী জাহাজ ব্যবহার করে নাব্যতা বাড়ানো
• গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সংরক্ষণাগার তৈরি
• রেললাইনে নতুন বিনিয়োগ
আর্টিক গেটওয়ের প্রধান নির্বাহী ক্রিস অ্যাভেরি বলেন, আধুনিকায়িত বন্দর পশ্চিম কানাডার পটাশ, কৃষিপণ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজসহ নানা পণ্য দ্রুত ইউরোপে পাঠাতে সাহায্য করবে। সামরিক ব্যয়ের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘোষণার পর বন্দরটি নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ঘাঁটি হিসেবেও কাজ করতে পারে।
বিশ্বশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা
কানাডার তুলনায় রাশিয়া অনেক এগিয়ে—বড় শহর, পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরসহ বিশাল সামরিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো রয়েছে তাদের আর্কটিকে। চীন নিজেকে “আর্কটিক-সংলগ্ন রাষ্ট্র” দাবি করে ইতিমধ্যে নতুন আর্কটিক পথ ব্যবহার করে ইউরোপে কার্গো পাঠিয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন এবং আর্কটিকে “গোল্ডেন ডোম” ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন।
আর্কটিকে অবকাঠামো নির্মাণের চ্যালেঞ্জ
পলিটেকনিক মন্ট্রিয়ালের প্রকৌশলী পুনেহ মাগহুল বলেন, “আর্কটিকে কিছু নির্মাণ করা মানে চাঁদে নির্মাণ করার মতো। দূরত্ব, কঠিন পরিবেশ, সম্পদের অভাব—সবই বড় চ্যালেঞ্জ।”
রাজনৈতিক বাস্তবতাও জটিল। চার্চিলসহ উত্তরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই আদিবাসী। অতীতে সরকারি বৈষম্যের শিকার হওয়ায় তারা ফেডারেল সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান। তাই চার্চিলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে স্থানীয়দের মতামত ও অংশগ্রহণের উপর।
আদিবাসীদের মালিকানায় বন্দরের নতুন অধ্যায়
২০১৮ সালে মেয়র মাইক স্পেন্স চার্চিলের বন্দর ও রেলপথ মার্কিন মালিক ওমনিট্র্যাক্সের কাছ থেকে কিনে নিতে নেতৃত্ব দেন। ২৯টি ফার্স্ট নেশন কমিউনিটির অংশীদারিতে গঠিত আর্টিক গেটওয়ে এখন বন্দর ও রেললাইন পরিচালনা করছে।

বর্তমানে বন্দর প্রায় অকার্যকর—দুই দশক আগে যেখানে বছরে দুই ডজন জাহাজ আসত, এখন সংখ্যা হাতে গোনা। কার্গো ট্রেনও সপ্তাহে একবারের বেশি আসে না। বন্দর মেরামতের জন্য এখন পচা কাঠ সরিয়ে নতুন ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
প্রায় এক শতক আগে বন্দর ও রেললাইন নির্মাণ করে কানাডা—লক্ষ্য ছিল ইউরোপে কৃষিপণ্য রফতানি সহজ করা এবং উত্তরাঞ্চলে জনবসতি বাড়ানো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চার্চিল ছিল সেনাদের ঘাঁটি। শীতল যুদ্ধেও এখানে যুক্তরাষ্ট্র–কানাডা যৌথ গবেষণা ও রাডার নেটওয়ার্ক পরিচালিত হয়।
জনসংখ্যা একসময়ে ছয় হাজার ছাড়ালেও পরে সামরিক কার্যক্রম বন্ধ হলে শহর জনশূন্য হতে শুরু করে। ২০১২ সালে শস্য রফতানির নিয়ম বদলের পর বন্দর ব্যবহারও কমে যায়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বন্দর–রেললাইন ভেঙে পড়তে থাকে। ২০১৭ সালে বন্যায় রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে ১৮ মাস শহর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
জলবায়ুর দ্বিমুখী প্রভাব
হাডসন বেতে বরফ কমে যাওয়ায় এখন পাঁচ মাস পর্যন্ত জাহাজ চলাচল সম্ভব—৮০–র দশকের তুলনায় প্রায় এক মাস বেশি। শতাব্দীর শেষে সারা বছরই নাব্যতা সম্ভব হতে পারে, বলেন বিশেষজ্ঞ ফেইয়ুয়ে ওয়াং।
কিন্তু গলতে থাকা পারমাফ্রস্ট রেললাইনকে বারবার ধসিয়ে দিচ্ছে। রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার ব্রেট ইয়ং জানান, বছরের পর বছর সমস্যা বাড়ছে এবং অনেক জায়গায় বছরে কয়েকবার মেরামত করতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের দ্বিধা ও আশঙ্কা
অনেক বাসিন্দা ‘পোর্ট চার্চিল প্লাস’ নিয়ে সংশয়ে। পর্যটন—বিশেষ করে মেরু ভালুক পর্যবেক্ষণ—শহরের প্রধান আয়ের উৎস। তারা আশঙ্কা করছেন, বড় বাণিজ্যিক বা সামরিক প্রকল্প এগোলে ছোট ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ডগ-স্লেড ব্যবসার মালিক ডেভিড ডালি বলেন, “এই প্রকল্পটা এলে তারা হয়তো বলবে, এটা কানাডার জন্য—তোমার নৌকা ব্যবসার জায়গা লাগবে না। তখন আমরা কোথায় যাব?”
আরেক পর্যটন ব্যবসায়ী লেরয় হুইটমোর সব-মৌসুমি সড়ক চান, তবে শহরে মানুষের অতিরিক্ত ভিড় হওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, “আমি রাস্তা চাই, আবার চাই না—চাই, কিন্তু অন্যরা যেন ব্যবহার না করে।”
উপসংহার
চার্চিলের সামনে এখন এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে—আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন পরিকল্পনা ও আদিবাসীদের শক্তিশালী ভূমিকা—সবকিছু মিলিয়ে। তবে ভবিষ্যতে চার্চিল কি বাণিজ্য ও সামরিক কেন্দ্র হয়ে উঠবে, নাকি পর্যটনকে কেন্দ্র করে এগোবে—তা নির্ভর করছে স্থানীয়দের সিদ্ধান্ত এবং কানাডার উত্তরাঞ্চলের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।
#: আর্কটিক_কানাডা চার্চিল_বন্দর কানাডার_সার্বভৌমত্ব হাডসন_বে জলবায়ু_পরিবর্তন আদিবাসী_সম্প্রদায়
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















