মালয়েশিয়ার সাবাহ অঙ্গরাজ্যে ২৯ নভেম্বরের আইনসভার নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থা, দারিদ্র্য, স্বল্প উন্নয়ন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি ক্ষোভ—সব মিলিয়ে ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এই নির্বাচনের ফল জাতীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
সাবাহর মানুষের দৈনন্দিন সংকট
গায়া দ্বীপের জেলে আজলান নিমাতাই এবং আওয়াং রসদি জানান, খারাপ আবহাওয়ায় কাজ বন্ধ থাকে, আয় কমে যায়। প্রায় ৬ হাজার মানুষের এই দ্বীপে পানি সরবরাহ অনিয়মিত, বাজারদর বাড়ছে, জীবিকা অনিশ্চিত।
আজলান বলেন, আর্থিক সংকটে তার সন্তানরা স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। আওয়াংয়ের ভাষায়, “আমরা রূপকথায় থাকি না। পরিষ্কার পানিও নেই। সরকারের সহায়তা দরকার।”
এই হতাশা পুরো সাবাহজুড়েই ছড়িয়ে আছে—নাগরিকরা ক্লান্ত, অবিশ্বাসী এবং পরিবর্তনের অপেক্ষায়।
কেন এই নির্বাচন আনোয়ারের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ
সাবাহ ভৌগোলিকভাবে কেন্দ্রীয় প্রশাসন থেকে দূরে হলেও রাজনীতিতে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক ভারসাম্যে পূর্ব মালয়েশিয়ার (সাবাহ–সারাওয়াক) সমর্থন ছাড়া কোনো কেন্দ্রীয় জোট স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকতে পারে না। এদিকে সাবাহবাসীর মধ্যে “সাবাহ ফর সাবাহানস”, অর্থাৎ সাবাহর অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিও বাড়ছে।
আনোয়ারের নেতৃত্বাধীন পাকাতান হারাপান জোট যদি ভালো ফল পায়, তবে তা স্থিতিশীলতার বার্তা দেবে। আর দুর্বল ফলাফল তার সংস্কার কর্মসূচি ও সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

রাজস্ব বণ্টন ও স্বায়ত্তশাসন—নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু
সাম্প্রতিক একটি আদালতের রায় অনুযায়ী সাবাহ কেন্দ্রীয় সরকার থেকে রাজস্বের ৪০% পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রাখে। আনোয়ার সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে না বলে জানানোয় বিষয়টি নির্বাচনে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। তেল–গ্যাস রাজস্ব থেকেও আরও বড় অংশ দাবি করছে সাবাহ।
সাবাহর জনসংখ্যা ৩৪ লাখ—দেশের ১০%। এটি দেশের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা; ২০২৪ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৭.৭%।
আনোয়ারের শেষ মুহূর্তের প্রচারণা
আফ্রিকা সফর থেকে ফিরে আনোয়ার কয়েকদিন ধরে পুরো সাবাহ চষে বেড়িয়েছেন। তুয়ারান এলাকায় তিনি ৬.৯ বিলিয়ন রিঙ্গিত উন্নয়ন ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি এবং সাবাহর বিদ্যুৎ বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ রাজ্যের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন।
তার বক্তব্য, “আরও উন্নয়ন চাইলে আপনাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—যারা কথা বলে বিভাজন সৃষ্টি করে, তাদের সমর্থন দিয়ে সবকিছু পাওয়া সম্ভব নয়।”
রাজ্যের জোট রাজনীতি ও দুর্নীতির ক্ষোভ
সাবাহর মুখ্যমন্ত্রী হাজিজি নূর নেতৃত্ব দিচ্ছেন জিআরএস (Gabungan Rakyat Sabah) জোটকে, যা আনোয়ারের জাতীয় জোটের অংশ নয়, তবে সাবাহতে সহযোগিতায় রয়েছে। তিনিও বলেন, “কেন্দ্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্কই উন্নয়নের চাবিকাঠি।”
তবে নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারের ঘনিষ্ঠ একজন রাজনৈতিক সচিবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জনঅসন্তোষ বাড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্রিজেট ওয়েলশের মন্তব্য—“আনোয়ার নিজেই এ নির্বাচনের দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এখন স্ক্যান্ডালের কারণে পরিস্থিতি কঠিন।”
৫২২ প্রার্থী—অত্যন্ত বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ
এই নির্বাচনে মোট ৫২২ প্রার্থী, ৩৩টি দল এবং ৭৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—সাবাহর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইলহাম সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী কোনো জোটই সরল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার মতো অবস্থায় নেই।
ইলহাম সেন্টারের পরিচালক হিসোমুদ্দিন বকর বলেন, “ঝুলে যাওয়া পরিষদ প্রায় নিশ্চিত। ফল ঘোষণার প্রথম ২৪ ঘণ্টাই সিদ্ধান্ত নেবে কোন জোট সরকার গঠন করবে।”

ভোটারদের অগ্রাধিকারে সৎ নেতৃত্ব ও স্থানীয় সমস্যা
জরিপ দেখায়, ভোটাররা দল নয়—প্রার্থীর সততা, স্থানীয় উপস্থিতি এবং সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
প্রধান বিরোধী দল ওয়ারিসানের নেতা শাফি আপদাল প্রচারে বলেন, “দুর্নীতিমুক্ত সরকার প্রয়োজন। সাবাহ এত সম্পদশালী হয়েও কেন দরিদ্র? বদল আনতেই হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সাবাহনদের দ্বারা সাবাহ শাসিত হতে হবে।”
শহরের ভোটারদের হতাশা ও বিনিয়োগের উদ্বেগ
ট্যাক্সিচালক কং নিয়ুক পেং বলেন, অনেক চীনা ভোটার রাজ্যভিত্তিক দলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। তাদের প্রশ্ন—“সারাওয়াক এত উন্নত হতে পারে, সাবাহ কেন পারে না?”
শিল্পমন্ত্রী ফুং জিন জে মনে করেন, “কোনো দল এককভাবে ক্ষমতায় যেতে পারবে না। তাই কেন্দ্রের মতোই একটি ঐক্যবদ্ধ সরকার স্থিতিশীলতার বার্তা দেবে।”
বিশ্লেষণ: বড় পরিবর্তন হয়তো আসবে না, কিন্তু সাবাহর দাবি জোরদার
বিশ্লেষক বিলাশিনি সোমাইয়া বলেন, “সাবাহর রাজনীতি রঙ বদলানো ক্যালেইডোস্কোপের মতো—স্বল্পমেয়াদি স্বার্থে গড়া জোটই বাস্তবতা। প্রার্থীর সংখ্যা বেশি মানেই গণতান্ত্রিক প্রাণশক্তি নয়; বরঞ্চ ক্লান্তি।”
তবে তিনি একটি প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখছেন—
“সাবাহবাসী কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আরও দৃঢ় অবস্থান এবং রাজ্যের অধিক স্বায়ত্তশাসন দাবি করছে।”
এই নির্বাচন শুধু সাবাহ নয়—সমগ্র মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলাফল নির্ধারণ করবে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার আগাম জাতীয় নির্বাচন ডাকবেন কি না এবং কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্ক কোন দিকে যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















