কাঠমান্ডুর ফেডারেল পার্লামেন্ট ভবনের সামনে ১৭ সেপ্টেম্বর নিহত বিক্ষোভকারীদের স্মরণে মোমবাতি জ্বালানো হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংস দমন ও উত্তেজিত জনতার হামলার ফলে ৭৬ জন নিহত এবং ২,৪২৯ জন আহত হয়। দেশজুড়ে সরকারি ভবন, রাজনৈতিক দলের কার্যালয়, গণমাধ্যম হাউস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আক্রমণ চালানো হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২.৫ বিলিয়ন ডলারে, যা নেপালের ২০২৪ সালের অর্থনীতির অর্ধেকেরও বেশি।
নেপালে সহিংস সেপ্টেম্বর: এক শিক্ষকের সব হারিয়ে যাওয়া
৯ সেপ্টেম্বর রাতে মধ্যবিন্দু শহরে ২.৫-তলা বাড়িতে ভিমলাল অধিকারী ছিলেন না। প্রায় ৪০ জন মুখোশধারী হামলাকারী হেলমেট পরে এসে তাঁর বাড়ির নিচতলায় আগুন লাগায়। পরিবারের জিনিসপত্র টেনে এনে আগুনে ফেলে দেওয়া হয়।
শহরের মেয়র অধিকারী বলেন, “তিন দশকের পরিশ্রম কয়েক ঘণ্টায় ছাই হয়ে গেল।” তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা প্রাণে বাঁচলেও বহু পরিবার ততটা সৌভাগ্যবান ছিল না।
৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশ গুলি চালায়, পরে নিরাপত্তা বাহিনী সরে গেলে জনতা সরকারি স্থাপনাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আক্রমণ করে। এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়েছিল আন্তর্জাতিক সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম হঠাৎ নিষিদ্ধ করার পর সৃষ্ট ক্ষোভ থেকে। তরুণ-নির্ভর এই বিক্ষোভ চাকরি সংকট, দুর্নীতি ও অকার্যকর শাসনের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভেরও বহিঃপ্রকাশ।
অলি সরকারের পতন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব
প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা অলি নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পর সাবেক প্রধান বিচারপতি সুসিলা কার্কির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন দায়িত্ব নিয়েছে। মার্চে নতুন নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে সরকার তদন্ত করছে কারা গুলি চালানোর আদেশ দিয়েছিল এবং কারা পরিকল্পিতভাবে দেশজুড়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালিয়েছে।
তবে দেশব্যাপী ক্ষোভ ও আবেগ তুঙ্গে থাকায় অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন—এই বিচার প্রক্রিয়া কি সত্যিকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারবে?
তদন্ত কমিশন ও বাংলাদেশের উদাহরণ
বাংলাদেশে যেমন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সপ্তাহে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে, নেপালেও অনেকে তেমন কঠোর বিচারের দাবি তুলছেন।
নেপাল ২০১৫ সালে যুদ্ধাপরাধ তদন্তে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করলেও আজও কোনো চূড়ান্ত ফল দেয়নি। প্রায় ৬০ হাজার সাক্ষ্য নেওয়া হলেও সিদ্ধান্তহীনতা ভুক্তভোগীদের হতাশ করেছে।
রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের শঙ্কা
মধ্যবিন্দুর মেয়র অধিকারী মনে করেন হামলাকারীরা স্থানীয় নয় এবং এটি ছিল কে.পি. শর্মা অলি ও তাঁর দলকে টার্গেট করার সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। তিনি এবং তাঁর ডেপুটি মেয়র পুলিশের কাছে ভিডিও–প্রমাণ জমা দিয়েছেন।
অপরদিকে, বহু ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু কাঠমান্ডুর সিংহদুরবারে এখনো আগুনে কালো হয়ে যাওয়া দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। একই ভবনে তদন্ত কমিশন সাক্ষ্যগ্রহণ করছে। কমিশনের নেতৃত্বে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক গৌরি বাহাদুর কার্কি। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ তাঁরা সুপারিশ জমা দেবেন।
তদন্তের শুরুতে নিরাপত্তা সংস্থা ও সরকারের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়—অলিসহ কোনো কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না এবং কোনো সংস্থা এ দায়িত্ব নেবে তা নিয়ে। শেষ পর্যন্ত অলি গ্রেপ্তার হননি; পুলিশ ও কমিশন আলাদা তদন্ত করছে।
অনেকে মনে করেন, কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে দুই দিনের—৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর—উভয় পক্ষের অপরাধ সমানভাবে তদন্তের ওপর।
অলির বক্তব্য এবং মানবাধিকার উদ্বেগ
২২ নভেম্বর একটি সমাবেশে অলি বলেন, তিনি কোনো ভুল করেননি এবং দেশ ছাড়বেন না। তবে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, ৯ সেপ্টেম্বরের লুটপাটের অভিযোগে ৫৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ৮ সেপ্টেম্বর গুলি চালানো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, তদন্ত স্বাধীন, সময়সীমাবদ্ধ ও স্বচ্ছ হওয়া জরুরি, যাতে অপরাধীরা আইনগত জবাবদিহি এড়াতে না পারে।
পোখারায় এখনও আতঙ্ক: ব্যবসার ক্ষতি ও পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম
মধ্যবিন্দুর উত্তরে ৫০ কিলোমিটার দূরের পোখারা শহরও অগ্নিসংযোগ ও লুটের জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যবসায়ীরা সিসিটিভি–ভিডিও জমা দিয়েছেন। অনেকে দোকান পুনরায় খুলতে ভয় পাচ্ছেন। স্থানীয় বণিক সমিতির নেতা গোকর্ণ কার্কি বলেন, “স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।”
নিহতদের পরিবারের ক্ষোভ
কাঠমান্ডুর গণেশ প্রসাদ চৌলাগাইনের ছেলে ৮ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভে গুলিতে নিহত হয়। তিনি এবং অন্যান্য নিহতের পরিবার অলি ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
চৌলাগাইন বলেন, “যুবকদের রক্তে প্রতিষ্ঠিত এই অন্তর্বর্তী সরকার যদি ন্যায়বিচার না দেয়, তা লজ্জাজনক।”
মানবাধিকার আইনজীবী রাজু প্রসাদ চপাইগেন মনে করেন, শুধু নিম্ন পর্যায়ের সহিংসতাকারীদের গ্রেপ্তার করলে তা ন্যায়বিচারের ভান সৃষ্টি করে। বরং যাঁরা আদেশ দিয়েছে তাদের চিহ্নিত করে দায়বদ্ধ করা জরুরি।
ন্যায়বিচার ও পুনর্মিলনের পথে
তদন্ত কমিশনের সদস্য বিজ্ঞান রাজ শর্মা বলেছেন, লোকজন ক্ষোভে ফেটে পড়লেও রাষ্ট্রের উচিত আইনি প্রক্রিয়া মেনে এগোনো। তিনি বলেন, “প্রথমে জবাবদিহি আসতে হবে, তারপরই পুনর্মিলন সম্ভব।”
সেপ্টেম্বরের সহিংসতার পর নেপাল এখন ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের কঠিন মোড়ে দাঁড়িয়ে। প্রভাবিত মানুষদের প্রত্যাশা—এইবার যেন সত্যিই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং নেপাল অতীতের মতো শাস্তিহীনতার চক্রে ফিরে না যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















