০৪:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ভোটের পর ফলাফল তৈরি হয় যেভাবে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কী, নির্বাচন এলেই কেন এই কথা শোনা যায়? রাশিয়ার শতাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো বিপর্যস্ত রোবোট্যাক্সি সেবার বিস্তারে স্মার্ট যাতায়াতে নতুন গতি আবুধাবিতে সবার জীবনে সঙ্গীতের প্রয়োজনীয়তা, দুবাইয়ের অধ্যাপকের গবেষণায় নতুন দিগন্ত আল আইনে আলোকিত ফুলের মহোৎসব, দেড় হাজার ঝলমলে পাপড়িতে ফুটে উঠল ভিন্নতার বার্তা শিল্প ও ক্রীড়া ঐক্যে দুবাইয়ে সম্মাননা পেলেন আহমেদ আল জাসমি শারজাহর আল ধাইদে সাহিত্য পরিষদ উদ্বোধন, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সৃজনশীল চর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন জুনের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, বৈঠকের প্রস্তাব ফ্লোরিডায় যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় ওমানের ভূমিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রশংসা, আঞ্চলিক শান্তির আশা জোরদার

হাঁটিয়ে আনা হয়েছিল মোয়াই, ইস্টার দ্বীপের পাথর মূর্তির রহস্যে নতুন ব্যাখ্যা

ইস্টার দ্বীপ, যাকে রাপা নুই বলা হয়, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের একেবারে নিঃসঙ্গ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি দ্বীপ। মূল ভূখণ্ড চিলি থেকে প্রায় দুই হাজার দুইশ মাইল দূরে এই দ্বীপে শত শত বিশাল পাথরের মূর্তি আজও মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য হয়ে আছে। কীভাবে কয়েক দশক টন ওজনের এই মূর্তিগুলো পাহাড়ের খনি থেকে উপকূলের পবিত্র স্থানে পৌঁছানো হয়েছিল, তা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

মোয়াই নির্মাণ ও দূরত্বের ধাঁধা
খ্রিস্টীয় বারোশ থেকে সতেরোশ শতকের মধ্যে আগ্নেয়গিরির গহ্বরে অবস্থিত রানো রারাকু খনি থেকে আগ্নেয় ছাই শক্ত হয়ে তৈরি পাথর কেটে এসব মোয়াই বানানো হয়। কোনো কোনো মূর্তির উচ্চতা প্রায় ত্রিশ ফুটের বেশি, ওজন আশি টনের কাছাকাছি। এখন পর্যন্ত প্রায় নয়শ পঞ্চাশটি মোয়াই শনাক্ত হয়েছে। বেশিরভাগ মূর্তি গ্রামের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন তারা জীবিতদের পাহারা দিচ্ছে। আবার কিছু মূর্তি সূর্যাস্তের দিকমুখী, যা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ব্যবহারের ইঙ্গিত করে।

হাঁটার মতো করে মূর্তি সরানোর তত্ত্ব
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রত্নতত্ত্ববিদ কার্ল লিপো ও টেরি হান্ট দাবি করেছেন, মোয়াইগুলোকে সোজা দাঁড় করিয়ে দোলানোর মাধ্যমে সামনে এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। দড়ি দিয়ে মাথার দিকে টান দিলে মূর্তিটি ডানে-বামে দুলে ধীরে ধীরে এগোয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, কয়েকজন মানুষ মিলেই কয়েক টন ওজনের প্রতিরূপ মূর্তি অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য দূরত্বে সরাতে পেরেছেন। গবেষকদের মতে, মোয়াইয়ের চওড়া ভিত্তি ও সামনের দিকে হেলে থাকা ভঙ্গি এই ধরনের গতির জন্যই উপযোগী করে বানানো।

পথ, ক্ষয় আর ভাঙনের ব্যাখ্যা
দ্বীপজুড়ে যেসব পথে পড়ে থাকা মোয়াই দেখা যায়, সেগুলোর আকৃতি ও অবস্থানও এই হাঁটার তত্ত্বকে সমর্থন করে বলে গবেষকরা দাবি করেছেন। দোলানোর সময় পড়ে গেলে পাশ ভেঙে যাওয়ার ব্যাখ্যা এতে মেলে। তাদের মতে, বারবার দোলানোর ফলে পথ নিজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে তৈরি হয়েছে, অর্থাৎ মূর্তি সরানো ছিল রাস্তা তৈরির অংশ।

বিরোধিতা ও ভিন্ন মত
তবে সবাই এই ব্যাখ্যায় একমত নন। কিছু গবেষকের মতে, পথের ধারে পাওয়া অনেক মূর্তি অক্ষত অবস্থায় আছে, যা ইঙ্গিত করে যে সেগুলো দাঁড়িয়ে রেখেই দীর্ঘ সময় রাখা হয়েছিল। আবার অনেকে মনে করেন, মূর্তিগুলো শুইয়ে কাঠের স্লেজ ও গড়নের ওপর টেনে নেওয়া হয়েছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদ জো অ্যান ভ্যান টিলবার্গের মতে, রাপা নুইয়ের মানুষ প্রয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, একটিমাত্র তত্ত্বে পুরো ইতিহাস ব্যাখ্যা করা কঠিন।

রাপা নুই সমাজ নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
একসময় ধারণা ছিল, মূর্তি বানানোর প্রতিযোগিতায় বন উজাড় করে দ্বীপবাসীরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছিল। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় সেই ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে, ইউরোপীয়দের আগমনের আগ পর্যন্ত রাপা নুই সমাজ কার্যকর ও সৃজনশীল ছিল। কঠিন পরিবেশের মধ্যেও তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকতে পেরেছিল এবং এমন স্মারক গড়েছিল, যা আজও বিশ্বকে বিস্মিত করে।

এই গবেষণা দেখাচ্ছে, ইস্টার দ্বীপের মোয়াই কেবল পাথরের মূর্তি নয়, বরং মানব উদ্ভাবন শক্তি ও অভিযোজন এর এক জীবন্ত সাক্ষ্য।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভোটের পর ফলাফল তৈরি হয় যেভাবে

হাঁটিয়ে আনা হয়েছিল মোয়াই, ইস্টার দ্বীপের পাথর মূর্তির রহস্যে নতুন ব্যাখ্যা

০৫:০৯:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫

ইস্টার দ্বীপ, যাকে রাপা নুই বলা হয়, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের একেবারে নিঃসঙ্গ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি দ্বীপ। মূল ভূখণ্ড চিলি থেকে প্রায় দুই হাজার দুইশ মাইল দূরে এই দ্বীপে শত শত বিশাল পাথরের মূর্তি আজও মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য হয়ে আছে। কীভাবে কয়েক দশক টন ওজনের এই মূর্তিগুলো পাহাড়ের খনি থেকে উপকূলের পবিত্র স্থানে পৌঁছানো হয়েছিল, তা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

মোয়াই নির্মাণ ও দূরত্বের ধাঁধা
খ্রিস্টীয় বারোশ থেকে সতেরোশ শতকের মধ্যে আগ্নেয়গিরির গহ্বরে অবস্থিত রানো রারাকু খনি থেকে আগ্নেয় ছাই শক্ত হয়ে তৈরি পাথর কেটে এসব মোয়াই বানানো হয়। কোনো কোনো মূর্তির উচ্চতা প্রায় ত্রিশ ফুটের বেশি, ওজন আশি টনের কাছাকাছি। এখন পর্যন্ত প্রায় নয়শ পঞ্চাশটি মোয়াই শনাক্ত হয়েছে। বেশিরভাগ মূর্তি গ্রামের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন তারা জীবিতদের পাহারা দিচ্ছে। আবার কিছু মূর্তি সূর্যাস্তের দিকমুখী, যা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ব্যবহারের ইঙ্গিত করে।

হাঁটার মতো করে মূর্তি সরানোর তত্ত্ব
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রত্নতত্ত্ববিদ কার্ল লিপো ও টেরি হান্ট দাবি করেছেন, মোয়াইগুলোকে সোজা দাঁড় করিয়ে দোলানোর মাধ্যমে সামনে এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। দড়ি দিয়ে মাথার দিকে টান দিলে মূর্তিটি ডানে-বামে দুলে ধীরে ধীরে এগোয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, কয়েকজন মানুষ মিলেই কয়েক টন ওজনের প্রতিরূপ মূর্তি অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য দূরত্বে সরাতে পেরেছেন। গবেষকদের মতে, মোয়াইয়ের চওড়া ভিত্তি ও সামনের দিকে হেলে থাকা ভঙ্গি এই ধরনের গতির জন্যই উপযোগী করে বানানো।

পথ, ক্ষয় আর ভাঙনের ব্যাখ্যা
দ্বীপজুড়ে যেসব পথে পড়ে থাকা মোয়াই দেখা যায়, সেগুলোর আকৃতি ও অবস্থানও এই হাঁটার তত্ত্বকে সমর্থন করে বলে গবেষকরা দাবি করেছেন। দোলানোর সময় পড়ে গেলে পাশ ভেঙে যাওয়ার ব্যাখ্যা এতে মেলে। তাদের মতে, বারবার দোলানোর ফলে পথ নিজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে তৈরি হয়েছে, অর্থাৎ মূর্তি সরানো ছিল রাস্তা তৈরির অংশ।

বিরোধিতা ও ভিন্ন মত
তবে সবাই এই ব্যাখ্যায় একমত নন। কিছু গবেষকের মতে, পথের ধারে পাওয়া অনেক মূর্তি অক্ষত অবস্থায় আছে, যা ইঙ্গিত করে যে সেগুলো দাঁড়িয়ে রেখেই দীর্ঘ সময় রাখা হয়েছিল। আবার অনেকে মনে করেন, মূর্তিগুলো শুইয়ে কাঠের স্লেজ ও গড়নের ওপর টেনে নেওয়া হয়েছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদ জো অ্যান ভ্যান টিলবার্গের মতে, রাপা নুইয়ের মানুষ প্রয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, একটিমাত্র তত্ত্বে পুরো ইতিহাস ব্যাখ্যা করা কঠিন।

রাপা নুই সমাজ নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
একসময় ধারণা ছিল, মূর্তি বানানোর প্রতিযোগিতায় বন উজাড় করে দ্বীপবাসীরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছিল। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় সেই ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে, ইউরোপীয়দের আগমনের আগ পর্যন্ত রাপা নুই সমাজ কার্যকর ও সৃজনশীল ছিল। কঠিন পরিবেশের মধ্যেও তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকতে পেরেছিল এবং এমন স্মারক গড়েছিল, যা আজও বিশ্বকে বিস্মিত করে।

এই গবেষণা দেখাচ্ছে, ইস্টার দ্বীপের মোয়াই কেবল পাথরের মূর্তি নয়, বরং মানব উদ্ভাবন শক্তি ও অভিযোজন এর এক জীবন্ত সাক্ষ্য।