যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন পথে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে ফিরে আসার এক বছর পর দেখা যাচ্ছে, অভিবাসন থেকে বাণিজ্য, প্রশাসন থেকে বিচারব্যবস্থা—রাষ্ট্রের প্রায় সব স্তরেই তিনি গভীর ও বিতর্কিত পরিবর্তন এনেছেন। এই এক বছরে তার সিদ্ধান্তগুলো যেমন সমর্থকদের উজ্জীবিত করেছে, তেমনি সমাজ ও রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ তৈরি করেছে।
অভিবাসনে কঠোরতা ও সীমান্তে কড়াকড়ি
নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ক্ষমতায় ফিরেই অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কড়া অভিযান শুরু হয়। সীমান্তে অনুপ্রবেশ কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে আসে। একই সঙ্গে আশ্রয়প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং বৈধ অভিবাসনেও কড়াকড়ি বাড়ে। শরণার্থী গ্রহণের সংখ্যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। অপরাধে অভিযুক্ত অননুমোদিত অভিবাসীদের বাধ্যতামূলক আটক এবং অভিবাসন সংস্থার বাজেট বাড়ানোর আইন কার্যকর হয়েছে। তবে ঘোষিত ব্যাপক বহিষ্কারের লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।
ফেডারেল প্রশাসনে ছাঁটাই ও পুনর্গঠন
সরকারি ব্যবস্থাকে ‘গভীর রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে বড় আকারে ছাঁটাই শুরু হয়। বিচার বিভাগ ও তদন্ত সংস্থায় শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল ঘটে। নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে নিয়োগ সুরক্ষা শিথিল হয়, ব্যাপক স্বেচ্ছা অবসর ও ছাঁটাইয়ের প্রস্তাব আসে। এক বছরে কয়েক লাখ কর্মী সরকারি চাকরি ছেড়েছেন, বিপরীতে নিয়োগ হয়েছে তুলনামূলক কম।
বাণিজ্যযুদ্ধ ও শুল্কের ধাক্কা
আমদানিতে শুল্ক বাড়িয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় বড় ধাক্কা দেওয়া হয়। প্রতিবেশী দেশ ও চীনের পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপে বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ে, দামেও চাপ পড়ে। পরে আলোচনার মাধ্যমে কিছু শুল্ক শিথিল হলেও কার্যকর শুল্কহার বহু দশকের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছায়। শিল্পে কর্মসংস্থান প্রত্যাশামতো বাড়েনি; উল্টো উৎপাদন খাতে চাকরি কমেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনীতি
দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। জ্বালানির দাম কিছুটা কমলেও নিত্যপণ্যের ব্যয় বেশি রয়ে গেছে। কিছু পণ্যে শুল্ক ছাড় দিয়ে বাজারে স্বস্তি আনার চেষ্টা চলছে। অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে প্রবৃদ্ধি দেখালেও সুদের হার কমানো নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে টানাপোড়েন অব্যাহত।
মাদকবিরোধী অভিযান ও সামরিক পদক্ষেপ
মাদকচক্র দমনে নজিরবিহীন কঠোরতা দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় সন্দেহভাজন নৌযানে সামরিক হামলা চালানো হয়। প্রশাসন এসব পদক্ষেপকে সশস্ত্র সংঘাতের যুক্তিতে বৈধ বললেও বহু আইন বিশেষজ্ঞ তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
যুদ্ধ, কূটনীতি ও ঘরোয়া সেনা মোতায়েন
বিদেশে যুদ্ধ না বাড়ানোর অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে মিশ্র চিত্র দেখা যায়। গাজায় যুদ্ধবিরতিতে ভূমিকা থাকলেও ইউক্রেন সংকটে দ্রুত সমাধান আসেনি। দেশের ভেতরে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ দমনে সেনা ও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন হয়, যা নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে।
বিচারব্যবস্থা ও বৈচিত্র্য নীতিতে পরিবর্তন
বিরোধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও মামলা শুরুর অভিযোগে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। একই সঙ্গে সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয়, পাঠ্যক্রম ও গবেষণায়ও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়।
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও জরুরি ক্ষমতার ব্যবহার
এই এক বছরে নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা স্পষ্ট। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ব্যয় স্থগিত বা বাতিলের নজির তৈরি হয়েছে। জরুরি ক্ষমতার বিস্তৃত ব্যবহার ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ভারসাম্যে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















