০৮:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬

চীনের একচেটিয়া দখল ভাঙতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন লড়াই, বিরল ধাতু ঘিরে কৌশল বদলের ইঙ্গিত

বিশ্বের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিরল ধাতুর বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চীনের প্রভাব প্রায় একচ্ছত্র। সেই বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এবার ধীরে হলেও নতুন পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। নিউ হ্যাম্পশায়ারের একটি ছোট শিল্প এলাকায় শুরু হওয়া নতুন প্রক্রিয়াজাতকরণ উদ্যোগ সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিরল ধাতু কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, যুদ্ধবিমান, শক্তিশালী চুম্বক, চিকিৎসা যন্ত্র ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নানা যন্ত্রে ব্যবহৃত বিরল ধাতু আসলে পৃথিবীতে খুব কম নয়, কিন্তু এগুলোকে ব্যবহারযোগ্য ধাতুতে রূপান্তর করা অত্যন্ত জটিল। এই কঠিন প্রক্রিয়ার দখল দীর্ঘদিন ধরে চীনের হাতে। বর্তমানে বিশ্বের নব্বই শতাংশের বেশি বিরল ধাতু সেখানে পরিশোধিত হয়, যা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য কৌশলগত উদ্বেগের বড় কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রের হারানো অবস্থান ফেরানোর চেষ্টা

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এই শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও চীনের পরিকল্পিত শিল্পনীতি ও শিথিল পরিবেশগত নিয়মের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। সস্তায় উৎপাদনের চাপে একে একে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের অনেক খনি ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এখন বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ছোট উদ্যোগ ও গবেষণাভিত্তিক সংস্থাগুলোর ওপর দায়িত্ব পড়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর।

নতুন প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ

নিউ হ্যাম্পশায়ারের কারখানায় বিরল ধাতুর গুঁড়া থেকে ধাপে ধাপে ধাতু তৈরি হচ্ছে উচ্চ তাপমাত্রার চুল্লিতে। পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে বায়ুদূষণ প্রায় না হয় এবং বিদ্যুৎ ছাড়া আলাদা কোনো ক্ষতিকর নিঃসরণ না ঘটে। চীনে ব্যবহৃত পুরোনো পদ্ধতিতে যেখানে ক্ষতিকর গ্যাস বের হয়, সেখানে এই পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থনীতি ও রাজনীতির টানাপোড়েন

এই শিল্পে লাভের অঙ্ক তুলনামূলক কম এবং উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় বড় বিনিয়োগকারীরা সাধারণত আগ্রহ দেখান না। তবুও সাম্প্রতিক বাণিজ্য দ্বন্দ্ব ও শুল্কযুদ্ধ পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের পর পশ্চিমা দেশগুলো বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে এবং সরকারি সহায়তাও জোরালো হচ্ছে।

সরকারের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

যুক্তরাষ্ট্র সরকার এই খাত পুনর্গঠনে বড় অঙ্কের সহায়তা দিচ্ছে এবং নির্দিষ্ট দামে পণ্য কেনার নিশ্চয়তাও দিচ্ছে। তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে শুধু বাজারের ওপর ভরসা করলে চলবে না। পরিবেশগত ঝুঁকি, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থায়ী ভর্তুকি নীতি—সব মিলিয়ে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

কৌশলগত গুরুত্বে নতুন অধ্যায়

বিরল ধাতুর পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রচেষ্টা সফল হলে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে নির্ভরতা কমবে। তবে পথটি সহজ নয়। তবুও এই উদ্যোগ ইঙ্গিত দিচ্ছে, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে ধীরে হলেও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দক্ষিণ চীন সাগরে চীন–ফিলিপাইন উত্তেজনা আবারও বাড়ছে

চীনের একচেটিয়া দখল ভাঙতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন লড়াই, বিরল ধাতু ঘিরে কৌশল বদলের ইঙ্গিত

০৬:২১:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬

বিশ্বের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিরল ধাতুর বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চীনের প্রভাব প্রায় একচ্ছত্র। সেই বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এবার ধীরে হলেও নতুন পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। নিউ হ্যাম্পশায়ারের একটি ছোট শিল্প এলাকায় শুরু হওয়া নতুন প্রক্রিয়াজাতকরণ উদ্যোগ সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিরল ধাতু কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, যুদ্ধবিমান, শক্তিশালী চুম্বক, চিকিৎসা যন্ত্র ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নানা যন্ত্রে ব্যবহৃত বিরল ধাতু আসলে পৃথিবীতে খুব কম নয়, কিন্তু এগুলোকে ব্যবহারযোগ্য ধাতুতে রূপান্তর করা অত্যন্ত জটিল। এই কঠিন প্রক্রিয়ার দখল দীর্ঘদিন ধরে চীনের হাতে। বর্তমানে বিশ্বের নব্বই শতাংশের বেশি বিরল ধাতু সেখানে পরিশোধিত হয়, যা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য কৌশলগত উদ্বেগের বড় কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রের হারানো অবস্থান ফেরানোর চেষ্টা

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এই শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও চীনের পরিকল্পিত শিল্পনীতি ও শিথিল পরিবেশগত নিয়মের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। সস্তায় উৎপাদনের চাপে একে একে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের অনেক খনি ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এখন বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ছোট উদ্যোগ ও গবেষণাভিত্তিক সংস্থাগুলোর ওপর দায়িত্ব পড়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর।

নতুন প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ

নিউ হ্যাম্পশায়ারের কারখানায় বিরল ধাতুর গুঁড়া থেকে ধাপে ধাপে ধাতু তৈরি হচ্ছে উচ্চ তাপমাত্রার চুল্লিতে। পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে বায়ুদূষণ প্রায় না হয় এবং বিদ্যুৎ ছাড়া আলাদা কোনো ক্ষতিকর নিঃসরণ না ঘটে। চীনে ব্যবহৃত পুরোনো পদ্ধতিতে যেখানে ক্ষতিকর গ্যাস বের হয়, সেখানে এই পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থনীতি ও রাজনীতির টানাপোড়েন

এই শিল্পে লাভের অঙ্ক তুলনামূলক কম এবং উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় বড় বিনিয়োগকারীরা সাধারণত আগ্রহ দেখান না। তবুও সাম্প্রতিক বাণিজ্য দ্বন্দ্ব ও শুল্কযুদ্ধ পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের পর পশ্চিমা দেশগুলো বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে এবং সরকারি সহায়তাও জোরালো হচ্ছে।

সরকারের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

যুক্তরাষ্ট্র সরকার এই খাত পুনর্গঠনে বড় অঙ্কের সহায়তা দিচ্ছে এবং নির্দিষ্ট দামে পণ্য কেনার নিশ্চয়তাও দিচ্ছে। তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে শুধু বাজারের ওপর ভরসা করলে চলবে না। পরিবেশগত ঝুঁকি, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থায়ী ভর্তুকি নীতি—সব মিলিয়ে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

কৌশলগত গুরুত্বে নতুন অধ্যায়

বিরল ধাতুর পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রচেষ্টা সফল হলে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে নির্ভরতা কমবে। তবে পথটি সহজ নয়। তবুও এই উদ্যোগ ইঙ্গিত দিচ্ছে, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে ধীরে হলেও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।