ভূমিকা
সুনামগঞ্জ নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাওর, বর্ষার জলমগ্ন জনপদ, শীতের শুকনো মাঠ, নৌকা আর দূরে পাহাড়ের ছায়া। এই বিস্তীর্ণ ভূপ্রকৃতির ভেতর অসংখ্য ছোট-বড় নদী ছড়িয়ে আছে, যেগুলো একসঙ্গে মিলে গড়ে তুলেছে সুনামগঞ্জের জীবনপ্রবাহ। সেই নদীগুলোর একটি ধোপাজান নদী। খুব বড় নয়, খুব পরিচিতও নয়, কিন্তু এলাকার মানুষের কাছে এই নদী নিছক পানির ধারা নয়, এটি স্মৃতি, জীবন আর প্রকৃতির সঙ্গে টিকে থাকার গল্প। ধোপাজান নদীর পাশেই ছড়িয়ে আছে সাদা পাথরের অঞ্চল, যেখানে স্বচ্ছ জল আর পাথরের উজ্জ্বলতা মিলেমিশে এক অনন্য প্রাকৃতিক দৃশ্য তৈরি করেছে।
নদীর উৎস ও প্রবাহের কথা
ধোপাজান নদীর সুনির্দিষ্ট উৎস নিয়ে নানা স্থানীয় কাহিনি আছে। কেউ বলেন এটি হাওরের ভেতর জন্ম নেওয়া নদী, আবার কারও মতে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি ছড়া আর খাল মিলেই ধোপাজানের জন্ম। বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল নেমে এলে নদীর চরিত্র বদলে যায়। শান্ত, ধীর স্রোতের নদী হঠাৎই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পানি বেড়ে গেলে নদীর তীর ঘেঁষে থাকা গ্রামগুলো এক অদ্ভুত দ্বৈত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। একদিকে ভয়, অন্যদিকে আশীর্বাদ। কারণ এই পানিই আবার পলি এনে জমিতে উর্বরতা বাড়ায়।

ঋতু বদলের সঙ্গে নদীর রূপ
ধোপাজান নদীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার ঋতুভিত্তিক রূপান্তর। বর্ষায় নদী যেন নিজের সবটুকু শক্তি আর সৌন্দর্য উজাড় করে দেয়। চারপাশে শুধু জল আর জল, দূরের গাছপালা পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে, নৌকা ছাড়া চলার উপায় থাকে না। বর্ষার এই সময়ে নদী জীবন্ত হয়ে ওঠে। মাছ আসে, জলজ উদ্ভিদ বাড়ে, পাখির আনাগোনা বেড়ে যায়।
শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে নদীর চেহারা আবার বদলে যায়। পানি নেমে গেলে দেখা দেয় বালুচর। কোথাও কোথাও সাদা পাথর জেগে ওঠে নদীর বুক থেকে। তখন নদী যেন আরেক রকম সৌন্দর্য ধারণ করে। এই সময়েই ধোপাজান নদীর পাশের সাদা পাথরের অঞ্চল সবচেয়ে বেশি নজর কেড়ে নেয়।
সাদা পাথরের ভূপ্রকৃতি
সুনামগঞ্জের কিছু অংশে নদীর তলদেশ আর তীরজুড়ে ছড়িয়ে আছে সাদা পাথর। এগুলো সাধারণত মসৃণ, গোলাকার বা চ্যাপ্টা, পানির ঘর্ষণে ধুয়ে ধুয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ধোপাজান নদীর আশপাশে এই সাদা পাথরের উপস্থিতি নদীটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। স্বচ্ছ পানির নিচে পাথরের সাদা রঙ সূর্যের আলোয় ঝিলমিল করে। অনেক জায়গায় এই পাথরের ওপর দিয়ে পানি বয়ে যায়, তৈরি হয় প্রাকৃতিক ঢেউ আর শব্দ।
এই সাদা পাথর শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, এলাকার মানুষের জীবনের সঙ্গেও জড়িত। কোনো কোনো স্থানে এই পাথর নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হয়, আবার কোথাও এটি পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
মানুষের জীবন ও নদী
ধোপাজান নদীর তীর ঘেঁষে বসবাসকারী মানুষের জীবন নদীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নদীই তাদের পানির উৎস, যাতায়াতের পথ, জীবিকার ভরসা। ভোরবেলা জেলেরা নৌকা নিয়ে নদীতে নামে। কারও জালে ওঠে ছোট মাছ, কারও ভাগ্যে বড় শিকার। এই মাছই বাজারে যায়, পরিবারের ভরণপোষণ চলে।
নদীর পানি দিয়ে কৃষকেরা জমিতে সেচ দেয়। বর্ষার পানিতে ধানক্ষেত ভরে ওঠে, শীতে সেই ধান কেটে ঘরে তোলা হয়। নদী না থাকলে এই কৃষিভিত্তিক জীবন কল্পনাই করা যায় না।

গ্রামীণ সংস্কৃতি ও সামাজিকতা
ধোপাজান নদী শুধু অর্থনৈতিক জীবনের অংশ নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও কেন্দ্র। নদীর ঘাটে বসে মানুষের আড্ডা, গল্প, হাসি-কান্না সবকিছু মিলেমিশে থাকে। শিশুদের সাঁতার শেখা, তরুণদের নৌকাবাইচের অনুশীলন, বয়স্কদের স্মৃতিচারণ সবই ঘটে এই নদীর তীরে।
বর্ষাকালে নৌকাবাইচের আয়োজন হলে ধোপাজান নদী উৎসবের রূপ নেয়। ঢোল, করতাল, মানুষের উল্লাসে নদীর দুই তীর মুখরিত হয়ে ওঠে। এই উৎসবগুলো হাওর সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হাওর, নদী ও সাদা পাথরের সম্পর্ক
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নদী আর হাওর একে অপরের পরিপূরক। ধোপাজান নদী হাওরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বিস্তৃত জলব্যবস্থা তৈরি করেছে। বর্ষায় হাওর ভরে গেলে নদী সেই পানির অংশ হয়ে যায়। শীতে পানি নেমে গেলে নদী আবার নিজের স্বতন্ত্র স্রোত ফিরে পায়।
এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ভেতরেই সাদা পাথরের অঞ্চল একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। হাওরের নরম কাদামাটির বিপরীতে সাদা পাথরের কঠিন উপস্থিতি প্রকৃতির বৈচিত্র্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
পর্যটনের সম্ভাবনা
ধোপাজান নদী ও সাদা পাথরের অঞ্চল পর্যটনের জন্য বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনো এই এলাকা বড় পরিসরে পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে যারা একবার এখানে এসেছে, তারা এই নিস্তব্ধ সৌন্দর্য ভুলতে পারে না।
স্বচ্ছ পানি, সাদা পাথরের নদীপথ, চারপাশের সবুজ পাহাড় আর গ্রামীণ জীবন মিলিয়ে এই অঞ্চল হতে পারে প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বর্গ। তবে পর্যটন বিকাশের ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষা সবচেয়ে বড় বিষয়। নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন নদী ও পাথরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

পরিবেশগত সংকট
অন্যান্য নদীর মতো ধোপাজান নদীও আজ সংকটের মুখে। পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করছে। সাদা পাথরের অঞ্চল থেকেও অতিরিক্ত পাথর তুলে নেওয়া হলে নদীর তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে পানির স্বচ্ছতা কমে, মাছের আবাস নষ্ট হয়।
এই সংকট শুধু প্রকৃতির নয়, মানুষেরও। কারণ নদী ক্ষতিগ্রস্ত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় নদীঘেঁষা মানুষের জীবনে।
নদীকে ঘিরে স্মৃতি ও গল্প
ধোপাজান নদী নিয়ে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ঘোরে নানা গল্প। কেউ বলেন এই নদীতে একসময় এত মাছ ছিল যে জাল ফেললেই ভরে উঠত। কেউ আবার স্মৃতিচারণ করেন শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা, যখন নদীর পাড়ে বসে তারা স্বপ্ন দেখতেন।
এই স্মৃতিগুলোই নদীকে জীবন্ত করে রাখে। কাগজে-কলমে ইতিহাস না থাকলেও মানুষের হৃদয়ে ধোপাজান নদীর ইতিহাস অমলিন।
![]()
ভবিষ্যতের পথে
ধোপাজান নদী ও তার সাদা পাথরের অঞ্চলকে টিকিয়ে রাখতে হলে পরিকল্পিত উদ্যোগ জরুরি। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তোলা এসবই হতে পারে ভবিষ্যৎ পথের অংশ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। কারণ নদীকে সবচেয়ে ভালো চেনে তার তীরের মানুষই। তাদের অভিজ্ঞতা আর সচেতনতা মিলেই ধোপাজান নদীকে বাঁচানো সম্ভব।
উপসংহার
ধোপাজান নদী হয়তো বড় নদী নয়, কিন্তু সুনামগঞ্জের প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এই নদীর স্রোতের সঙ্গে মিশে আছে হাওরের জীবন, গ্রামীণ সংস্কৃতি আর সাদা পাথরের নিস্তব্ধ সৌন্দর্য। ধীরে বয়ে চলা ধোপাজান তাই শুধু একটি নদী নয়, এটি একটি অঞ্চলের আত্মা।
Sarakhon Report 



















