রান্নাঘরের পরিচিত বীজের তেল নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সূর্যমুখী, ক্যানোলা কিংবা সয়াবিন তেলকে কেউ কেউ বিষাক্ত বলে আখ্যা দিচ্ছেন, আবার দাবি করা হচ্ছে এগুলো হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ এই অভিযোগগুলোর বেশিরভাগকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ও ওমেগা ছয়
বীজের তেলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো এতে থাকা ওমেগা ছয় ফ্যাটি অ্যাসিড। অনেকেই মনে করেন, এই উপাদান শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি করে। তবে নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় দেখা গেছে, ওমেগা ছয় প্রদাহ বাড়ায় না বরং শরীরে এমন প্রাকৃতিক উপাদান তৈরি করে, যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে দুই লাখের বেশি মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা বেশি পরিমাণে উদ্ভিজ্জ তেল গ্রহণ করেছেন, তাদের হৃদরোগ ও ক্যানসারে মৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলক কম। বিপরীতে, যারা বেশি মাখন খেয়েছেন, তাদের ঝুঁকি বেশি ছিল ।

কোলেস্টেরল ও রক্তে চর্বির প্রভাব
বীজের তেলে থাকা লিনোলিক অ্যাসিড রক্তের ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল কমাতে সহায়ক। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের রক্তে এই ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা বেশি, তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম। বিজ্ঞানীদের মতে, এই উপাদান রক্তে চিনি ও ইনসুলিনের কার্যকারিতাও উন্নত করতে পারে, যা টাইপ দুই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়।
ওমেগা তিন ও ছয়ের ভারসাম্য
অনেক সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ওমেগা তিন ও ওমেগা ছয়ের অনুপাত। পশ্চিমা খাদ্যাভ্যাসে ওমেগা ছয়ের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তবে গবেষকরা বলছেন, সমাধান হিসেবে ওমেগা ছয় কমানোর চেয়ে ওমেগা তিনের গ্রহণ বাড়ানো বেশি কার্যকর। কারণ দুই ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিডই শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় এবং দুটিই স্বাস্থ্য উপকারে ভূমিকা রাখে।
প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে উদ্বেগ
বীজের তেল উৎপাদনে রাসায়নিক ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে হেক্সেন নামের রাসায়নিক ব্যবহৃত হলেও পরবর্তী ধাপে তেল পরিশোধনের সময় এসব উপাদান অপসারণ করা হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতিকর উপাদান থাকার প্রমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। যারা এড়াতে চান, তাদের জন্য ঠান্ডা চাপে নিষ্কাশিত তেল একটি বিকল্প, যদিও সেগুলোর দাম তুলনামূলক বেশি।

ক্যানসার গবেষণার নতুন দিক
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ এক ধরনের স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে লিনোলিক অ্যাসিড টিউমারের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারে। তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, এটি নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এবং সাধারণ মানুষের জন্য বীজের তেল পরিহার করার কোনো সুপারিশ নয়। বরং সম্পূর্ণভাবে ওমেগা ছয় বাদ দিলে শরীরের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
কোন তেল তুলনামূলক ভালো
গবেষণায় ক্যানোলা ও সয়াবিন তেল নিয়ে সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া গেছে। এই তেলগুলোতে স্বাস্থ্যকর চর্বির ভারসাম্য ভালো এবং রক্তের কোলেস্টেরল ও ওজন নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। কিছু গবেষণায় ক্যানোলা তেলকে জলপাই তেলের চেয়েও কার্যকর বলা হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে।
ভয় নয়, ভারসাম্যই মূল কথা
পুষ্টিবিদদের মতে, বীজের তেল নিয়ে ভয় ছড়ানোর পেছনে আংশিক সত্য ও ভুল ধারণার মিশ্রণ রয়েছে। অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের সঙ্গে বীজের তেলের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বাস্তবে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও কৃত্রিম উপাদানই বেশি ক্ষতিকর। সঠিক মাত্রায় এবং ঘরে রান্নায় ব্যবহার করলে বীজের তেল স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















