ইরানের মুদ্রাবাজারে অস্থিরতার প্রতিবাদে গত রোববার যখন প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়, তখনই তেহরান টাইমস লিখেছিল যে শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলনকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কাজে লাগাতে পারে। এই দুই রাষ্ট্র ইরানে প্রতিবাদকে জীবন্ত গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে নয়, বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্র উৎখাতের হাতিয়ার হিসেবে দেখে।
দুঃখজনকভাবে, তেহরান টাইমসের সেই আশঙ্কাই সত্যি হতে শুরু করেছে। তবে তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে লক্ষ্য অর্জনের আশা করছেন, তা বাস্তবায়িত হবে বলে মনে হয় না।
প্রাথমিক বিক্ষোভ ও সরকারের প্রতিক্রিয়া
বিক্ষোভের সূচনা হয় তেহরানের প্রধান বাজারগুলোতে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানি রিয়ালের নজিরবিহীন পতনের প্রতিবাদে দোকানিরা দোকান বন্ধ করে নিজ নিজ এলাকার প্রধান চত্বরে জড়ো হন। প্রথম দুই দিনে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ সবচেয়ে বেশি ছিল, যদিও তা খুব কম ক্ষেত্রেই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয়। কিছু বিচ্ছিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, অচেনা কয়েকজন ব্যক্তি, যাদের মধ্যে নারী ও তরুণ পুরুষও ছিলেন, বাজারের দোকানিদের রাস্তা অবরোধ ও শহরে ভাঙচুরে উসকানি দেন। তবে দোকানিরা তাদের চিনতে না পারায় এবং কোন দোকানের লোক তারা জানতে চাইলে ওই ব্যক্তিরা সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
সোমবার ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানকে পরিবর্তন করা হয়। এরপর কয়েক দিনের মধ্যেই রিয়ালের মূল্য কিছুটা স্থিতিশীল হয়, স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে এবং বিভিন্ন খাতের শ্রমিক সংগঠনের নেতারা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। বৃহস্পতিবারের মধ্যে স্বাভাবিক কার্যক্রম অনেকটাই ফিরে আসে।
রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান ও তাঁর মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য বিক্ষোভকারীদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে উত্তেজনা কমাতে নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেন।

সশস্ত্র অনুপ্রবেশ
এখনও কোথাও কোথাও অল্পসংখ্যক বাজারি শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছেন। এসব সমাবেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ রয়েছে এবং দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন থাকলেও অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কিন্তু বৈধ বিক্ষোভ কমে আসার পর এবং সরকার ও জনগণের মধ্যে সংলাপে অগ্রগতি দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের পশ্চিম সীমান্তবর্তী কয়েকটি প্রদেশে ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা শুরু হয়। এসব অঞ্চল দিয়ে ইরাকের মাধ্যমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অস্ত্র পাচার তুলনামূলক সহজ বলে ধারণা করা হয়।
এই সশস্ত্র ব্যক্তিরা সহিংস ও প্রাণঘাতী কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে। তারা রাস্তায় পার্ক করা গাড়িতে আগুন দিয়েছে, হুমকি ও হামলার মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য করেছে। এক ঘটনায় ব্যবসার মালিককে হত্যা করা হয়, আরেক ঘটনায় পুরো প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়। তারা হাতে তৈরি বিস্ফোরক দিয়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং সশস্ত্র অতর্কিত আ দেখিয়ে থানা ও সরকারি ভবন দখলের চেষ্টা করেছে। পশ্চিম ইলামের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুখোশধারী ভারী অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা দেশের নেতাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে আকাশে গুলি ছুড়ছে, পরে বিশেষ বাহিনীর হাতে তারা নিষ্ক্রিয় হয়।
এখন পর্যন্ত এই অস্থিরতায় কয়েকজন নিহত ও আহত হয়েছেন। অন্তত দুইজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত এবং ১৩ জন আহত হয়েছেন। আলাদাভাবে, এক দাঙ্গাকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরক ছোড়ার আগেই সেটি বিস্ফোরিত হয়ে নিহত হয়।
দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মারভদাশতে দোকান বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় এক ফল বিক্রেতাকে সশস্ত্র ব্যক্তিরা হত্যা করে। হামাদান প্রদেশে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি প্রকাশ্য সম্পত্তি ভাঙচুর বন্ধ করতে বলায় নির্মমভাবে মারধরের শিকার হন এবং তিনি এখনো সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। হামলাকারীরা ভীতি ছড়াতে সেই হামলার ভিডিও প্রকাশ করে। একই ধরনের ঘটনায় দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া এক মধ্যবয়সী নারীও মুখোশধারীদের হাতে মারধরের শিকার হন।
পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি শহরে, বিশেষ করে রাতের বেলায়, ছোট পরিসরে দাঙ্গা অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার এড়িয়ে গিয়ে গ্রেপ্তারের পথ বেছে নিয়েছে, যদিও সংশ্লিষ্ট শহরগুলোতে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তবে ইরানের পুলিশপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ-রেজা রাদান সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি সহনশীলতার নীতি শেষ করতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আগের এই নীতি গ্যাংগুলোকেই আরও সাহসী করে তুলেছিল।

এক্স ও ইনস্টাগ্রামে চলা তথাকথিত বিপ্লব
অনলাইনে একই সঙ্গে ব্যাপক বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা শুরু হয়েছে। কয়েক বছর আগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতনবিক্ষোভ, ইসফাহানের সাধারণ পথচারীদের ভিডিও কিংবা ২০২২ সালের অস্থিরতার ফুটেজ নতুন করে ব্যবহার করে পশ্চিমা ফার্সি ভাষার গণমাধ্যম ও পশ্চিমে বসবাসকারী সাবেক ইরানি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হচ্ছে। এসব ভিডিওতে কৃত্রিমভাবে অডিও যোগ করে ক্ষমতাচ্যুত শাহের ছেলের পক্ষে স্লোগান দেখানো হচ্ছে, যিনি জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং জায়নবাদী শাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখেন।
এ ছাড়া কয়েকজন সাবেক অভিনেতা এক্সে তাঁদের অনুসারীদের পুলিশ হত্যা ও অস্ত্র দখলের আহ্বান জানাচ্ছেন। অসংখ্য অভিযোগ ও প্রকাশ্য সহিংসতায় উসকানি সত্ত্বেও এসব পোস্ট সরানো হয়নি। দেশ ছাড়ার পর বিদেশে কাজের সংকটে থাকা এসব ব্যক্তি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার নজর কাড়তে তরুণদের উসকানি দিচ্ছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
অনলাইনে ব্যবসার বিরুদ্ধেও হয়রানি চলছে। বিশেষ করে নারীদের মালিকানাধীন ছোট অনলাইন দোকানগুলোকে তথাকথিত বিপ্লবের সময় ব্যবসা চালানোর দায়ে বিশ্বাসঘাতক বলা হচ্ছে। তেহরান টাইমসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব হয়রানিমূলক অ্যাকাউন্টের বেশির ভাগেরই অনুসারী নেই, পোস্ট নেই বা খুব কম, আর প্রোফাইল ছবিও সাধারণ নারীদের মতো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভূমিকা প্রকাশ্যে
প্রাথমিক বিক্ষোভ শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উচ্ছ্বাস গোপন রাখতে পারেনি। সশস্ত্র গোষ্ঠী মাঠে নামার আগেই দেওয়া তাদের বক্তব্য পরে নিজেদের বিশ্লেষকদের কাছেই অকাল ও জনসমর্থন ক্ষতিগ্রস্তকারী বলে সমালোচিত হয়।
এর মধ্যে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার ফার্সি ভাষার এক্স অ্যাকাউন্ট ইরানিদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়ে দাবি করে, ইসরায়েল শুধু কথায় নয়, বাস্তবেও তাদের পাশে আছে। পরে ইসরায়েলি টেলিভিশনের আলোচকরা দাঙ্গাকারীদের সশস্ত্র, প্রশিক্ষিত ও পরিচালিত বলে উল্লেখ করে ইরানের সামরিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠান উৎখাতে সহায়তার আহ্বান জানান।
বিদেশি সমর্থনের আরও প্রমাণ দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক এক কর্মকর্তা নতুন বছরের পর এক্সে লেখেন, ইরান সমস্যায় পড়েছে। তিনি নিষেধাজ্ঞার শিকার ইরানি জনগণকে এবং তাদের পাশে থাকা প্রতিটি মোসাদ এজেন্টকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানান।
ট্রাম্প নিজে সহিংস ব্যক্তিদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী আখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেন এবং বলেন, আমরা প্রস্তুত আছি। এই মন্তব্য ইরানি কর্তৃপক্ষের কড়া প্রতিক্রিয়া ডেকে আনে। তারা সতর্ক করে দেয়, হুমকি বাস্তবায়িত হলে প্রথমে প্রাণ হারাবে অঞ্চলটিতে থাকা মার্কিন সেনারা।
ইরানি নাগরিকরাও প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এক্সে ট্রাম্প চুপ করো শিরোনামে প্রচারণা শুরু করেন। সরকারের সমালোচকরাও তাঁর দ্বিমুখী সহানুভূতি প্রত্যাখ্যান করে জুনের হামলায় এক হাজারের বেশি ইরানির মৃত্যুর দায় তাঁর ওপর চাপান। ওই ১২ দিনের হামলায় অবকাঠামো ধ্বংস হয় এবং অধিকাংশ নিহত ছিলেন বেসামরিক মানুষ, পাশাপাশি সামরিক সদস্য ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীরাও মারা যান।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি উল্টো ফল দিয়েছে। অর্থনৈতিক দাবিতে বিক্ষোভ জনসমর্থন পেলেও বিদেশি সহিংসতার দিকে মোড় নেওয়ায় সাধারণ মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিদেশি হস্তক্ষেপবিরোধী ইরানি সমাজ ক্রমেই সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে এবং অধিকাংশ মানুষই চায় না তাদের দেশ লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো পরিণতির শিকার হোক।
এরপর কী
নিকট ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সরকারের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর। পশ্চিম সীমান্তবর্তী ছোট শহরগুলোতে রাতে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা চললেও পরিস্থিতি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর অতীত অভিজ্ঞতার বাইরে নয়। সশস্ত্র গোষ্ঠী দমনে অভিযানে আগামী দিনে হতাহতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অর্থনৈতিক দিক থেকে পেজেশকিয়ান প্রশাসন বাজারিদের তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রশমনে সফল হয়েছে। তবে কাঠামোগত সমস্যার কার্যকর সমাধান জরুরি, নইলে ভবিষ্যতে আবারও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে। ওয়াশিংটন যে নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ আরও কঠিন করবে, তা বলাই বাহুল্য।
তেহরান টাইমস 



















