আমাদের মাথার ওপরে যেন এক বিশাল সমুদ্র। সেই সমুদ্রের নাম বাতাস। চোখে না দেখা এই বাতাসেই লুকিয়ে আছে অজস্র প্রশ্ন, আর সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জীবনভর কাজ করে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। মানুষের শ্বাসে ঢুকে পড়া অতি সূক্ষ্ম কণা গুলো কিভাবে রক্তে মেশে, শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এমনকি রোগ ছড়াতে সাহায্য করে—এই অনুসন্ধানই আজ বৈশ্বিক উদ্বেগের কেন্দ্রে।
অতি ক্ষুদ্র কণার অজানা জগৎ
বাতাসে থাকা অতি ক্ষুদ্র কণাগুলো এতটাই ছোট যে সাধারণ দূষণ পরিমাপক যন্ত্রেও ধরা পড়ে না। এদের আকার মানুষের চুলের প্রস্থের তুলনায় হাজার গুণ ছোট। এই কণাগুলো ফুসফুস পেরিয়ে রক্তপ্রবাহে ঢুকে প্রদাহ সৃষ্টি করে, বাড়ায় হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা। ধোঁয়া, সালফেট, নাইট্রেট ও সূক্ষ্ম ধাতব কণার মিশ্রণে তৈরি এই অদৃশ্য শত্রু।

কোভিড সময়ে বদলে যাওয়া ধারণা
এই কণাগুলোর বিপদ নিয়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে গবেষণা করছেন পোলিশ–অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানী লিডিয়া মোরাভস্কা। মহামারির সময় তিনি দেখিয়েছিলেন, রোগ শুধু বড় ফোঁটা পড়ে ছড়ায় না, বরং শ্বাস নেওয়া, কথা বলা কিংবা কাশির সময় বের হওয়া অতি ক্ষুদ্র কণা ও দীর্ঘক্ষণ বাতাসে ভেসে থেকে অন্যের শরীরে ঢুকে পড়ে। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের চাপের মুখে অবশেষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাতাসে ভাসমান সংক্রমণের বিষয়টি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
স্বীকৃতি এল দেরিতে
মহামারির শুরুতে হাত ধোয়ার ওপর জোর থাকলেও মুখোশের গুরুত্ব উপেক্ষিত ছিল। সেই দেরিতে সিদ্ধান্তের মাশুল দিতে হয়েছে অসংখ্য প্রাণ দিয়ে। এই গবেষণা ও সাহসী অবস্থানের জন্য লিডিয়া মোরাভস্কা বিশ্ব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় স্থান পান টাইম সাময়িকী-এর স্বীকৃতিতে এবং অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক পুরস্কার লাভ করেন।

ঘরের ভেতরের বাতাস সবচেয়ে বিপজ্জনক
মানুষ জীবনের নব্বই শতাংশ সময় কাটায় ঘরের ভেতর। অথচ ঘরের বাতাসের মান নিয়ে তেমন ভাবনা নেই। অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল থাকা ঘরে অতিক্ষুদ্র কণার ঘনত্ব অনেক সময় বাইরের বাতাসের চেয়েও বেশি হয়। স্কুল, হাসপাতাল, হোটেল—সব ক্ষেত্রেই নজরদারির অভাব প্রকট, আর দায়িত্ব বিভাজনের জটিলতায় কার্যকর উদ্যোগ থমকে থাকে।
নিয়ন্ত্রণের পথে ধীর অগ্রগতি
দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের বৈশ্বিক নির্দেশিকায় অতি ক্ষুদ্র কণাকে হুমকি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ইউরোপেও বাধ্যতামূলক নজরদারির সিদ্ধান্ত এসেছে। গবেষকদের মতে, কম খরচের সেন্সর দিয়ে বাতাসের মান পর্যবেক্ষণ শুরু করাই হতে পারে প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ।
জীবাশ্ম জ্বালানি ছাড়ার তাগিদ
প্রাকৃতিক উৎসে এসব কণা থাকলেও আধুনিক জীবনে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে বিপুল দূষণ। বাড়তে থাকা জনসংখ্যা ও শক্তির চাহিদা এই সংকটকে আরও তীব্র করছে। বিজ্ঞানীদের মতে, পরিষ্কার জ্বালানির দিকে দ্রুত না গেলে এই নীরব হুমকি আরও গভীর হবে।
বিজ্ঞানের কথাই শেষ কথা
লিডিয়া মোরাভস্কার স্বপ্ন একটাই—সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকবে বিজ্ঞান। শিশুদের শিক্ষা থেকে নীতিনির্ধারণ পর্যন্ত বিজ্ঞান ভিত্তিক চিন্তাই পারে মানুষকে এই অদৃশ্য বিপদ থেকে রক্ষা করতে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















