বাতাস, ঘণ্টা, আর বিপর্যয়ের গতি
লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির দুই প্রান্তে একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়া জোড়া দাবানলের এক বছর পর এখন ঘটনাটাকে বোঝাতে সামনে আসছে কয়েকটি কঠিন সংখ্যা। ২০২৪ সালের ৬ জানুয়ারি পালিসেডস ও ইটন এলাকায় আগুন প্রায় একই সময়ে জ্বলে ওঠে, আর এই বিপর্যয় দেখিয়ে দেয়—চরম আবহাওয়ার সঙ্গে নগর এলাকার ঘন বসতি মিললে কত দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অনেক বাসিন্দা বলছেন, ধ্বংস যতটা দ্রুত হয়েছিল, পুনর্গঠন ততটা ধীর। ক্ষতের চিহ্ন এখনো অনেক জায়গায় দৃশ্যমান।
সবচেয়ে আগে যে সংখ্যা বিপদের মাত্রা বোঝায়, সেটি হলো বাতাসের গতি। পাহাড়ি অঞ্চলে ঘণ্টায় প্রায় ৯০ মাইল পর্যন্ত দমকা হাওয়া পূর্বাভাস ছিল—এমন বাতাসে অঙ্গার দূরে উড়ে গিয়ে ছাদ-ঘরে, শুকনো গাছপালায়, এমনকি বাড়ির ফাঁকফোকরেও আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। সেদিন রেড ফ্ল্যাগ সতর্কতা জারি হয়েছিল, আর সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া ‘সান্তা আনা’ বাতাসে কাবু ছিল। কয়েক মাস ধরে বৃষ্টি কম থাকায় ঝোপঝাড় ও ঘাস ছিল টিন্ডার-ড্রাই। আবহাওয়া বার্তায় ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট—এটি প্রাণঘাতী বাতাসের ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।

আরেকটি সংখ্যা বলে দেয় আগুনের বিস্ফোরক বিস্তারের সময়টা কত কম ছিল। পালিসেডস এলাকায় ছোট একটি আগুনের খবর থেকে দ্রুত বড় ঘটনার দিকে গড়ায় পরিস্থিতি। অল্প সময়ের মধ্যে ধোঁয়ার বিশাল মেঘ দূর থেকে দেখা যেতে থাকে, আর দমকল বাহিনীর জন্য ‘ঘণ্টার ভেতর’ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এমন প্রেক্ষাপটে প্রস্তুতির ভাষাও বদলায়—চরম বাতাস ও শুষ্কতা এক হলে দেরি মানে মিনিটে হিসাব।
মোট পোড়া এলাকার সংখ্যা শহুরে বিপর্যয়ের মাত্রা বোঝায়। দুই দাবানলে মিলিয়ে প্রায় ৫৯ বর্গমাইল এলাকা পুড়ে যায়—যা বড় একটি শহরের পরিসরের সঙ্গে তুলনীয়। আগুন শুধু ছড়িয়ে পড়ে থামেনি; সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে জ্বলেছে। পালিসেডস দাবানল এক মাসের বেশি সময় ধরে জ্বলেছিল, ইটন দাবানলও তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়। তদন্তকারীরা দেখেছেন, একটি আগুন আগের দিনের আরেকটি আগুনের ঘটনার ধারাবাহিকতা থেকে বড় আকার নেয়—অর্থাৎ ঝুঁকি একবার তৈরি হলে তা দ্রুত ফিরে আসতে পারে।
পুনর্গঠন, সহায়তা, আর জবাবদিহি
মানবিক ক্ষতির সংখ্যাটি আরও নির্মম: মোট ৩১ জনের মৃত্যু—দুই আগুনে ভাগ হয়ে গেছে এই মৃত্যু সংখ্যা। এটি মনে করিয়ে দেয়, দাবানল কেবল সম্পদের ক্ষতি নয়; সঠিক সময়ে সরতে না পারলে এটি গণহতাহতের ঘটনায় পরিণত হতে পারে। অনেক বাসিন্দা বলেছেন, পরিচিত রাস্তা কয়েক মিনিটে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, দৃশ্যমানতা কমে যায়, আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় থাকে খুব অল্প।

ক্ষয়ক্ষতিও বিপুল। দুই আগুনে মোট ১৬ হাজারের বেশি স্থাপনা ধ্বংস হয়। আলতাডেনা ও পালিসেডসসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে হাজার হাজার ঘরবাড়ি ও ভবন মাটিতে মিশে যায়। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় সংকট—ধ্বংসস্তূপ সরানো, পারমিট, বীমা জটিলতা, নির্মাণ শ্রম ও উপকরণের সংকট। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে চমকপ্রদ সংখ্যা হলো—এত বড় ক্ষতির পরও এখন পর্যন্ত কত কম বাড়ি নতুন করে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি সহায়তাও তর্কের কেন্দ্রে। ক্যালিফোর্নিয়ার পক্ষ থেকে ফেডারেল দুর্যোগ সহায়তায় কয়েক দশমিক বিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে, কিন্তু অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া ধীর। ফলে অনেক পরিবার অস্থায়ী বাসা আর উচ্চ পুনর্গঠন ব্যয়ের মাঝে আটকে আছে। দাতব্য সহায়তা শুরুতে দ্রুত বেড়েছিল—বড় প্রতিশ্রুতি ও ব্যক্তিগত ফান্ডরেইজিংয়ে শত শত মিলিয়ন ডলার উঠেছে—তবু অনুদান দিয়ে দীর্ঘ পুনর্বাসন কাঠামো বদলানো কঠিন।
জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে। পালিসেডস দাবানলের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মামলায় সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে কয়েক দশকের কারাদণ্ডের সম্ভাবনা রয়েছে, আর ইটন দাবানলের কারণ এখনো তদন্তাধীন। তবে ব্যক্তি মামলার বাইরেও বড় প্রশ্নটি একই—এমন এলাকায় কীভাবে ঝুঁকি কমানো হবে, যেখানে বাতাস, খরা আর ঘন বসতি বারবার একসঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। সংখ্যাগুলো সান্ত্বনা দেয় না, কিন্তু বাস্তবতা স্পষ্ট করে: চরম পরিস্থিতিতে দাবানল এক দিনের মধ্যেই আধুনিক শহরকে অচল করে দিতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















