সিআইএর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত অ্যালড্রিচ হ্যাজেন এমস আর নেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পরবর্তীকালে রাশিয়ার হয়ে দীর্ঘ নয় বছর গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে যে ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন, তা আজও নজিরবিহীন। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের কাম্বারল্যান্ড ফেডারেল সংশোধনাগারে পাঁচ জানুয়ারি তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল চুরাশি বছর।
সিআইএর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ভাঙন
সিআইএর একজন কর্মকর্তা হিসেবে এমস মস্কোর হাতে তুলে দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলোর জন্য কাজ করা সোভিয়েত ও ওয়ারশ চুক্তিভুক্ত বহু গুপ্তচরের নাম। এর ফল ছিল মর্মান্তিক। অন্তত দশজন সিআইএ বা মিত্র গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট প্রাণ হারান বলে বিভিন্ন তদন্তে উঠে আসে। এই ঘটনা সিআইএর তৎকালীন সাতচল্লিশ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
অর্থকষ্ট থেকে বিশ্বাসঘাতকতা
গ্রেপ্তারের পর কারাগারে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমস নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, আর্থিক সংকট তাঁকে গুপ্তচরবৃত্তির পথে ঠেলে দেয়। তবে শুধু অর্থ নয়, দীর্ঘদিন দ্বৈত পরিচয়ে কাজ করতে করতে তাঁর চিন্তা ও অনুভূতি আলাদা খোপে ভাগ হয়ে গিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। নিজের ভাষায়, দেশ, পরিবার ও দায়িত্বের অনুভূতিকে আলাদা করে দেখতেই তিনি এই কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন।
মস্কোর সঙ্গে গোপন লেনদেন
উনিশশো পঁচাশি সালে ওয়াশিংটনে সোভিয়েত দূতাবাসে ঢুকে প্রথমবারের মতো তিনি সিআইএর নিয়োগকৃত দুই এজেন্টের নাম দেন। এর বিনিময়ে পান মোটা অঙ্কের অর্থ। পরে ধাপে ধাপে তিনি প্রায় সব পরিচিত সোভিয়েত ও মিত্র গোয়েন্দার পরিচয় ও নথি মস্কোর হাতে তুলে দেন। বদলে নগদ এক মিলিয়নের বেশি অর্থ এবং রাশিয়ায় সম্পত্তির প্রতিশ্রুতি পান। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরও তিনি রাশিয়ার হয়ে তথ্য পাচার অব্যাহত রাখেন।

আত্মপক্ষসমর্থনের সুর
১৯৯৪ সালের আদালতে দাঁড়িয়ে এমস স্বীকার করেছিলেন যে তিনি গুরুতর বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি গুপ্তচর যুদ্ধকে তুচ্ছ করে বলেন, এসবের বাস্তব নিরাপত্তা প্রভাব সীমিত। এই বক্তব্যে তাঁর অনুতাপের চেয়ে একধরনের আত্মপক্ষসমর্থনের সুরই বেশি ফুটে ওঠে।
ব্যক্তিজীবন ও দ্বৈত জীবন
প্রথম স্ত্রী ন্যান্সি সেগেবার্থের সঙ্গে বিচ্ছেদের সময় মেক্সিকো সিটিতে মারিয়া দেল রোসারিও কাসাসের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সময়েই কেজিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। পরে রোম ও ওয়াশিংটনে পোস্টিংয়ের সময়ও গোপন সংকেত ও লুকোনো স্থানে নথি রেখে তথ্য পাচার চলতে থাকে।

বিলাসী জীবন ও সন্দেহহীনতা
ওয়াশিংটন এলাকায় জাগুয়ার গাড়ি ও নগদ অর্থে কেনা দামী বাড়ি তাঁর জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও দীর্ঘদিন সিআইএ ও এফবিআই এর সন্দেহের বাইরে ছিলেন এমস। শেষ পর্যন্ত রুশ এজেন্টদের একের পর এক নিখোঁজ হওয়ার সূত্র ধরে তদন্ত গিয়ে পৌঁছায় তাঁর কাছে।
কারাগারের জীবন ও পরবর্তী অধ্যায়
বায়ান্ন বছর বয়সে আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত এমস পেনসিলভানিয়ার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কারাগারে আইন পড়াশোনা করেন এবং একাধিক মামলা করেন। রাশিয়া থেকে পাওয়া অর্থের ওপর কর দাবি নিয়ে আইআরএসের মামলায় তিনি পরাজিত হন। কারাগারেই তাঁর জীবনের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র প্রচারিত হয় এবং তাঁর লেখা চিঠিপত্র নিলামে ওঠে।
শৈশব থেকে সিআইএ পর্যন্ত
উইসকনসিনে জন্ম নেওয়া এমসের বাবা ছিলেন শিক্ষক ও পরে সিআইএর গোপন বিভাগে কর্মরত। কিশোর বয়সেই সিআইএতে সাময়িক কাজের মাধ্যমে তাঁর গোয়েন্দা জগতে প্রবেশ। নাটক নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত সিআইএর ক্যারিয়ার প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন তিনি। মদ্যপানের সমস্যার অভিযোগ সত্ত্বেও তাঁকে পাল্টা গোয়েন্দা বিশ্লেষণ বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়, যেখানে ছিল সবচেয়ে সংবেদনশীল তথ্যের ভাণ্ডার।
শেষ পর্যন্ত যে স্মৃতি
কারাগারে থেকেও সমসাময়িক বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বিতর্কে আগ্রহী ছিলেন এমস। পলিগ্রাফ পরীক্ষার সমালোচনা করে লেখা তাঁর চিঠি প্রমাণ করে, শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিজেকে ব্যবস্থার চেয়ে একধাপ এগিয়ে ভাবতেই ভালোবাসতেন। সিআইএর ইতিহাসে তাঁর নাম তাই থেকে যাবে সবচেয়ে ক্ষতিকর বিশ্বাসঘাতকের তালিকায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















