কড়া অবস্থান, তবে হিসেবি ভাষা
মেক্সিকো ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সেই অভিযানের নিন্দা জানিয়েছে, যেখানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সরিয়ে আনা হয়। বিবৃতিতে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কথা বলা হলেও এমন ভাষা এড়ানো হয়েছে, যা সরাসরি সংঘাত উসকে দিতে পারে। প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউমের সরকার এখানে একটি সীমারেখা টানতে চাইছে: লাতিন আমেরিকায় সামরিক ধাঁচের হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া যাবে না, একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগও বন্ধ করা যাবে না।
এই অবস্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হিসাবও আছে। শেইনবাউম চান নিজেকে এমন এক নেতা হিসেবে তুলে ধরতে, যিনি নীতিগতভাবে দৃঢ়, কিন্তু অযথা ঝুঁকি নেন না। কারণ অঞ্চলজুড়ে সাম্প্রতিক বিতর্কে “দ্রুত ও কঠোর” পদক্ষেপের কথা বাড়ছে—কখনও মাদক পাচার ঠেকানোর নামে, কখনও কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর বিরুদ্ধে। মেক্সিকো জানে, আজকের বক্তব্য কাল নীতিতে বদলে যেতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিসরে আবারও শোনা যাচ্ছে মেক্সিকোর কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে একতরফা অভিযান বা সীমান্ত পেরিয়ে হামলার কথা। এমন আলোচনা মেক্সিকোর জন্য অস্বস্তিকর—কারণ এতে দেশটির সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে। মেক্সিকোর সরকার বহুদিন ধরেই বলে এসেছে, নিরাপত্তা সহযোগিতা হতে হবে চুক্তি ও নিয়মের ভেতরে, এবং মেক্সিকোর ভূখণ্ডে অভিযান পরিচালনার নেতৃত্ব থাকবে মেক্সিকোর হাতেই।

ভেনেজুয়েলার ঘটনাকে মেক্সিকো তাই “প্রিসিডেন্ট” হিসেবে দেখছে। কোনো দেশের সরকারকে অপরাধের অভিযোগে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো যদি স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে একই যুক্তি “নিরাপত্তা”র নামে মেক্সিকোর ক্ষেত্রেও প্রয়োগের আশঙ্কা বাড়ে। ফলে এই নিন্দা কেবল ভেনেজুয়েলা নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকির প্রতিও ইঙ্গিত।
চাপের মধ্যেই সহযোগিতা
নিন্দার পাশাপাশি শেইনবাউম প্রশাসন দৃশ্যমানভাবে নিরাপত্তা তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে “একতরফা পদক্ষেপের” যুক্তি দুর্বল হয়। কার্টেল প্রভাবিত এলাকাগুলোতে অভিযান, বড় নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে চাপ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের কথাও সরকার তুলে ধরছে। একই সঙ্গে অভিবাসন ইস্যুতে সমন্বিত পদক্ষেপ, মানব পাচার ও চোরাচালান চক্র ভাঙার প্রচেষ্টা—এসবকে মেক্সিকো দেখাতে চাইছে বাস্তব অগ্রগতির প্রমাণ হিসেবে।
শেইনবাউমের সামনে বাস্তবতা হলো, তাঁকে “বিরোধিতা বনাম আত্মসমর্পণ”—এই দ্বিধাবিভক্তিতে পড়তে হলে চলবে না। কৌশলটা দেখতে এমন: যথেষ্ট সহযোগিতা করা, যাতে ওয়াশিংটন একতরফা পদক্ষেপের প্রয়োজন দেখাতে না পারে; আবার প্রকাশ্যে স্পষ্ট করে বলা, সামরিক হস্তক্ষেপ বা সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করা কোনো পথ গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে এই ভারসাম্য সহজ নয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা দ্রুত বদলায়। কখনও মাদক জব্দের পরিসংখ্যান, কখনও সীমান্ত পরিস্থিতি, আবার কখনও রাজনৈতিক বক্তৃতা—সব মিলিয়ে চাপ তৈরি হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মেক্সিকোর “সেরা প্রতিরক্ষা” হলো নিজেদের উদ্যোগকে ধারাবাহিক ও বিশ্বাসযোগ্য করা, যাতে অক্ষমতা বা অনিচ্ছার অভিযোগ দাঁড় করানো কঠিন হয়। একই সঙ্গে সরকার চাইছে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এমন হুমকি–পাল্টা হুমকির চক্র এড়াতে।
আগামিদিনে আসল পরীক্ষা হবে—আলোচনা কি যৌথ আইন প্রয়োগ, গোয়েন্দা সমন্বয় ও অপরাধ অর্থায়ন ঠেকানোর কাঠামোর ভেতরেই থাকবে, নাকি সামরিক ভাষা ও “ইন্টারভেনশন” ভাবনা বাড়বে। ভেনেজুয়েলা নিয়ে মেক্সিকোর অবস্থান স্পষ্ট করে দিল—অঞ্চলে হস্তক্ষেপকে নীতি হিসেবে স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা হলে মেক্সিকো তার বিরোধিতা করবে, যদিও দরকারি সহযোগিতার দরজাও খোলা রাখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















