নিউইয়র্কে নামার পর মাথার ভেতর যেন প্রশাসনিক ঝামেলার এক অদৃশ্য ঘূর্ণি। কাগজপত্র, ফোনকল, ভিড় আর কংক্রিটের জঙ্গল মিলিয়ে ক্লান্তি চেপে বসেছিল। এমন অবস্থায় শহরের মাঝখানে এক টুকরো সবুজের খোঁজে হাঁটতে বেরোনোই বদলে দিল অনুভূতি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই হাঁটা পৌঁছে দিল এমন এক জায়গায়, যেখানে শহরের শব্দ থেমে গিয়ে মনটা হালকা হয়ে আসে। এই অভিজ্ঞতাই নতুন করে প্রশ্ন তোলে, ভারতের শহরগুলোতে এমন বড় সবুজ পার্ক কেন নেই।
সবুজের শক্তি আর শহরের মনস্তত্ত্ব
শহরের মাঝখানে বড় সবুজ এলাকা কেবল বিনোদনের জায়গা নয়। গাছ, জলাশয় আর খোলা প্রান্তর মানুষের মানসিক চাপ কমায়, আশার অনুভূতি জাগায়। নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, পরিবার আর পর্যটকদের মেলবন্ধন। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা, তবু সবাই সেখানে কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পায়। এই স্বস্তিই শহুরে জীবনের ভারসাম্য।
শহর গরম হওয়া আর সবুজের ভূমিকা
কংক্রিট আর পিচ সূর্যের তাপ শুষে নিয়ে শহরকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। এই তাপ দ্বীপ প্রভাবে গরম বেড়ে যায়, অসুস্থতা বাড়ে। সবুজ এলাকা এই চক্র ভাঙতে পারে। গাছের ছায়া আর পাতার ভেতরের জলীয় প্রক্রিয়ায় বাতাস ঠান্ডা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত সবুজ থাকলে শহরের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। অথচ ভারতের বহু শহরে মাথাপিছু সবুজ খোলা জায়গা অত্যন্ত কম ।
জল, বৃষ্টি আর হারিয়ে যাওয়া জলাধার
ভারতের বৃষ্টি মৌসুমি ও অল্প সময়ে প্রবল। প্রাচীন শহরগুলো এই বাস্তবতা মাথায় রেখে গড়ে উঠেছিল। চারদিকে ছিল পুকুর, দিঘি, জলাধার, যা বর্ষার জল ধরে রেখে শুকনো সময়ে ভূগর্ভস্থ জল বাঁচিয়ে রাখত। আধুনিক নগরায়নে সেই জলাধার ভরাট হয়ে গেছে। ফল হিসেবে কখনো বন্যা, কখনও তীব্র জলসংকট। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের জলাধার ও তার চারপাশের সবুজ ভূগর্ভস্থ জল স্তর টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা রাখে ।
)
জনসংখ্যা বিস্ফোরণ আর ভবিষ্যৎ শহর
আগামী কয়েক দশকে ভারতের শহুরে জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার পথে। এই বিপুল মানুষের জন্য যে অবকাঠামো তৈরি হবে, তার বড় অংশ এখনও নির্মাণ বাকি। এখানেই সুযোগ। যদি সবুজ পার্ক, জলাধার আর খোলা জায়গাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা হয়, তবে ভবিষ্যতের শহর হবে বেশি বাসযোগ্য, বেশি সহনশীল।
সরকার, সমাজ আর অংশীদারত্ব
শহরের সবুজ রক্ষায় কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নাগরিক অংশগ্রহণ আর সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্ব বড় ভূমিকা নিতে পারে। সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা পার্ক বা জলাধার স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে, সংস্কৃতি আর পর্যটনের কেন্দ্র হতে পারে। সংগীত, শিল্প আর প্রকৃতির মিলনে শহর নতুন প্রাণ পায়।
সবুজ মানেই আশার ঠিকানা
নিউইয়র্কের সেই পার্ক থেকে বেরিয়ে তুষার ঝেড়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছিল, প্রকৃতি যেন শহরের ভেতর বন্দি নয়, বরং শহরকে নতুনভাবে বাঁচতে শেখাচ্ছে। ভারতের শহর গুলোর জন্যও এই শিক্ষাই সবচেয়ে জরুরি। বড় সবুজ পার্ক বিলাস নয়, বরং সুস্থ ভবিষ্যতের শর্ত।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















