একটি দেশে কীভাবে ঐতিহ্য রক্ষা ও সংরক্ষণ করা যায়, যেখানে স্থানীয় মন্দিরের প্রতিমা সম্ভবত প্রাচীন রোমেরও আগের, যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও পুরোনো গির্জা এখনো দাঁড়িয়ে আছে, আর সাধারণ মানুষ ঘরের ভেতরেই ধরে রেখেছে প্রাচীন উত্তরাধিকার, নিদর্শন ও অলংকার—এই প্রশ্ন বহুদিনের।
ওয়েবসাইট, জাদুঘর, স্মৃতি প্রকল্প ও কফি টেবিল বই এই কাজে ভূমিকা রেখেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত মে মাসে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় চালু করে ‘হার ঘর মিউজিয়াম’ উদ্যোগ, যার লক্ষ্য দেশের বিভিন্ন ঘরে সংরক্ষিত নিদর্শন ও সংগ্রাহকদের ধনভাণ্ডার নথিভুক্ত করা।
কলকাতাভিত্তিক ন্যাশনাল কাউন্সিল অব সায়েন্স মিউজিয়ামসের মাধ্যমে কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। জমা পড়া শত শত ছবি, ভিডিও ও প্রামাণ্য নথি স্ক্যান করে বিরল নিদর্শনের একটি অনলাইন ভাণ্ডার তৈরি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন স্থানীয় জাদুঘরকেও এতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ পর্যন্ত জমা পড়া ১৫৪টি নিদর্শন ও ব্যক্তিগত সংগ্রহের মধ্যে ১৮টির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিষয়বস্তু প্রকাশিত হয়েছে। উদ্যোগটির জন্য আলাদা ওয়েবসাইট ও স্বতন্ত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচয় তৈরির কাজও চলছে।
এই তালিকায় থাকা কয়েকজন সংগ্রাহকের গল্প—

লেখার অন্য রকম ইতিহাস
কলকাতার অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী সৌভিক রায় মূলত ডাকটিকিট সংগ্রাহক। তার সংগ্রহে রয়েছে ডাকটিকিট, মুদ্রা, ওলিওগ্রাফ, লিথোগ্রাফ ও পেন্সিল। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, পেন্সিলই এখন তার সবচেয়ে দুর্লভ ও প্রিয় সম্পদ।
তার কাছে থাকা সাড়ে ছয় হাজার পেন্সিলের মধ্যে কিছু একশ বছরেরও বেশি পুরোনো। এর মধ্যে আছে ১৯৩৫ সালের কলকাতার একটি পেন্সিল, যার গায়ে মোড়ানো ক্যালেন্ডার, চীনা মার্কিং পেন্সিল, শতবর্ষী সিডার কাঠের পেন্সিল, আর বিজ্ঞাপন মোড়ানো ভিনটেজ পেন্সিল। সঙ্গে আছে ১৯২০-এর দশকের শানপেনার, যার একটি ধাতুতে তৈরি রিকশার আদলে।
রায় বলেন, আমরা যা সংগ্রহ করি, তা আমাদেরই অংশ। এই বস্তুগুলো জীবন্ত বলে মনে হয়, আমি প্রায়ই ওদের সঙ্গে কথা বলি। ভবিষ্যতে এদের কী হবে জানি না, তবে সংরক্ষণ জরুরি।
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই ‘হার ঘর মিউজিয়াম’ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা হলো, সংগ্রাহকরা চাইলে তাদের সংগ্রহ জাতীয় পরিষদের কাছে উইল করে দিতে পারবেন। পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক সরকারি জাদুঘরে সেগুলো প্রদর্শিত হবে। অনেক সংগ্রাহকই দান করতে আগ্রহী।
এ উদ্যোগের আওতায় ভবিষ্যতে প্রস্তাবিত ‘জনগণের সংগ্রহ জাতীয় জাদুঘর’-এ এসব নিদর্শন স্থান পেতে পারে, যা আঞ্চলিক জাদুঘরগুলোতে বিস্তৃত থাকবে।

ছোট ছোট বিস্ময়
উত্তর কলকাতার একটি গলিতে প্রয়াত সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার সুশীল কুমার চট্টোপাধ্যায়ের তিনতলা বাড়ি। প্রথম তলায় রয়েছে তার অমূল্য সংগ্রহ—প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গুপ্তচর ক্যামেরা, রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠের রেকর্ডসহ ভিনাইল ডিস্ক, ১৯১২ সালের পকেট মাইক্রোস্কোপ, অস্ট্রেলিয়ান নৌবাহিনীর ব্যবহৃত সূর্যঘড়ি, আর আঠারো শতকের কাচখচিত নীলকর কারখানার ঘণ্টা।
তার ছেলে গৌতম চট্টোপাধ্যায় বলেন, বাবা এই সংগ্রহকে বলতেন ‘অতীতের আশ্রয়’। কখনো কখনো তিনি এখানে এসে নীরবে বসে থাকেন এবং ভাবেন, হয়তো এই শব্দগুলো একসময়ের মালিকদের, বাবারও, ফিরে এসে নিজেদের সম্পদ দেখতে আসা।
ক্যাবিনেটের জ্বর
গুজরাটের ভালসাড়ে সামীরকুমার আর্যার সংগ্রহে আছে হাজার হাজার দেশলাইয়ের বাক্স, কিছু শতবর্ষী। তিনি একে বলেন ‘পকেটের জাদুঘর’। বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানো এই সংগ্রহে রয়েছে হিন্দু দেবদেবী ও পৌরাণিক চরিত্রের ছবি, রাজা রবি বর্মার শিল্পে অনুপ্রাণিত নকশা, চুলের তেল, সাবান ও ওষুধের ক্ষুদ্র বিজ্ঞাপন। পরে যুক্ত হয়েছে রাজকীয় প্রতিকৃতি, স্বাধীনতা আন্দোলন ও স্বদেশি আন্দোলনের প্রতীক।

গোয়ালিয়রের কলেজছাত্র শিবাংশ অরোরার সংগ্রহে রয়েছে সবচেয়ে প্রাচীন কিছু নিদর্শন। তার সংগ্রহে থাকা মুদ্রা, ডাকটিকিট ও নোটের মধ্যে আছে তৃতীয় থেকে চতুর্থ শতকের পদ্মাবতীর নাগাদের তাম্রমুদ্রা এবং প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো রৌপ্য পাঞ্চমার্ক মুদ্রা।
আলো জ্বালাও
পুনের অটোমোটিভ ডিজাইনার মহেশ লঙ্কারের কাছে আছে বারো শতাধিক টর্চ। এর মধ্যে রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত আলো, সাবমেরিনের লাইট এবং বন্দুকের আদলে তৈরি টর্চ। তার ফ্ল্যাটে রাখা এই সংগ্রহ সপ্তাহান্তে দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। তার স্বপ্ন, একদিন ভারতের প্রথম টর্চ জাদুঘর গড়ে তোলা।
জাতীয় পরিষদের মহাপরিচালক বলেন, এগুলো কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, আমাদের ঐতিহ্যের প্রতিফলন। এই উদ্যোগ তরুণ প্রজন্মকে সংগ্রহ ও সংরক্ষণে উৎসাহিত করবে।
অতীতকে উপেক্ষা করা যায় না, বলেন সৌভিক রায়। গাছের শিকড়ের মতোই এগুলো—যা না থাকলে ডালপালাও থাকত না।
নিজের কোনো ধনভাণ্ডার নথিভুক্ত করতে চাইলে জাতীয় পরিষদের ওয়েবসাইটে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
গৌরী এস 



















