আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনটির মতে, সময়োপযোগী ও কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত না নেওয়া হলে ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো কঠিন হয়ে পড়বে।
নির্বাচন ঘিরে স্থিতিশীলতার আহ্বান
শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিসিসিআই অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দল এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজনের আহ্বান জানায়। সংগঠনটি বলেছে, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ সম্ভব নয়।
বিনিয়োগ আস্থার গুরুত্ব
ডিসিসিআইয়ের মতে, স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ দেশীয় উদ্যোক্তা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপে প্রবৃদ্ধি পুনরুজ্জীবিত করতে এই আস্থা অত্যন্ত জরুরি।
২০২৬ সালের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার জোরদার করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ, ব্যবসা সহজীকরণ এবং সামগ্রিকভাবে ব্যবসার খরচ কমানোর ওপর জোর দিয়েছে চেম্বার। পাশাপাশি অবকাঠামো শক্তিশালী করা ও নীতিগত কাঠামো উন্নত করার মাধ্যমে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ
ডিসিসিআই রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, সম্ভাবনাময় খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নে সহজ প্রবেশাধিকার এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে। দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এসব উদ্যোগ অপরিহার্য বলে মনে করছে সংগঠনটি।
জ্বালানি সংকট ও প্রতিযোগিতা
চলমান জ্বালানি সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন ও শিল্প কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ডিসিসিআই। এতে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্ষয় হচ্ছে। চেম্বারের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমেয় জ্বালানি মূল্যনীতি, গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
বিদেশি মুদ্রা ও আর্থিক খাত
ডিসিসিআই জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন জ্বালানি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানিকে ব্যয়বহুল করে তুলছে, যা রপ্তানিমুখী শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি আমদানি পরিশোধে মুদ্রা বিনিময় চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রণোদনা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে তারা।
রাজস্ব ও ঋণ ব্যবস্থাপনা
সংগঠনটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়তা, কর আইন আধুনিকীকরণ, করজাল সম্প্রসারণ এবং নিয়ম মেনে কর দেওয়া ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধের ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো, প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানো এবং সুশাসন জোরদার করার মাধ্যমে আর্থিক খাতে তারল্যচাপ কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
সরকারি ঋণ ও বেসরকারি বিনিয়োগ
ডিসিসিআই সতর্ক করেছে, ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত সরকারি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে। এতে বিশেষ করে স্থানীয় উৎপাদন ও কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এলডিসি উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে সার্বিক অর্থনৈতিক প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ডিসিসিআই। সংগঠনটির মতে, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রধান বাণিজ্য অংশীদার ও আঞ্চলিক জোটের সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন জরুরি।
২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির নির্ধারক
ডিসিসিআই বলেছে, রপ্তানি বৈচিত্র্য, নিরবচ্ছিন্ন শিল্প উৎপাদন, শক্তিশালী স্থানীয় শিল্প, আধুনিক অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সম্প্রসারণ এবং যুক্তিসংগত কর ও শুল্ক সংস্কার—এসবই ২০২৬ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার প্রধান নিয়ামক হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















