এক সময় যাকে স্বপ্নের ঠিকানা বলা হতো, আজ সেই ফ্লোরিডাই অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠছে। বাড়ির দাম, কর, বীমা আর কনডোমিনিয়াম ফি একসঙ্গে এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে যে রোদেলা রাজ্যে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই চাপ সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে উপকূলীয় কনডো বাজারে, যেখানে নিরাপত্তা আইন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব একসঙ্গে আঘাত হেনেছে ।
স্বপ্নের শুরু, বাস্তবের ধাক্কা
ওহাইও থেকে পরিবার নিয়ে ফ্লোরিডায় পাড়ি দিয়েছিলেন এরিক জনসন। সমুদ্রের ধারে বাড়ি, উষ্ণ আবহাওয়া আর খোলা আকাশ—সব মিলিয়ে জীবন যেন স্বর্গের কাছাকাছি। সন্তানের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্যও ফ্লোরিডাকে আদর্শ মনে হয়েছিল। তখন বাড়ির দাম তুলনামূলক কম, ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল নিশ্চিন্ত ভাবনা।
কিন্তু অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই সেই নিশ্চিন্ততা ভেঙে পড়ে। কনডো ভবনের সংস্কার, নিরাপত্তা পরীক্ষা আর বিশেষ চাঁদার চাপ তাদের আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছেড়ে অন্য রাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হয় পরিবারটি।

সার্ফসাইডের ট্র্যাজেডি ও নতুন আইন
দক্ষিণ ফ্লোরিডার সার্ফসাইডে শ্যামপ্লেইন টাওয়ার্স সাউথ ভবন ধসের পর রাজ্যজুড়ে কনডো নিরাপত্তা নিয়ে বড় পরিবর্তন আসে। ওই মর্মান্তিক ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি রাজ্য প্রশাসনকে কঠোর আইন প্রণয়নে বাধ্য করে। নতুন আইনে কনডো মালিক সমিতিকে বাধ্যতামূলকভাবে বড় অঙ্কের রিজার্ভ গড়ে তুলতে হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা যায়।
আইনজীবী ক্যাথরিন আমাদোরের মতে, এতদিন যে অবহেলা চলছিল, এই আইন তার ইতি টেনেছে। তবে বাস্তবে এর বোঝা পড়ছে সাধারণ মালিকদের কাঁধে, যাদের অনেকেই এককালীন বড় অঙ্কের টাকা জোগাড় করতে পারছেন না।
বাড়ছে খরচ, কমছে সহনশীলতা

মহামারির সময় ফ্লোরিডায় বাইরের রাজ্য থেকে মানুষের ঢল নামে। দূরবর্তী কাজের সুযোগে অনেকেই স্থায়ীভাবে চলে আসেন। এর ফলে বাড়ির দাম দ্রুত বাড়ে। একই সঙ্গে সম্পত্তি কর ও বাড়ির বীমার খরচও লাফিয়ে ওঠে। কনডো ফি বেড়ে যাওয়ায় বহু ইউনিট বাজারে উঠলেও ক্রেতা মিলছে না।
ফ্লোরিডা রিয়েলটরসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্র্যাড ও’কনর বলছেন, সুদের হার বাড়ার পর চাহিদা কিছুটা কমেছে, কিন্তু দাম এখনো আগের উচ্চ স্তরেই রয়ে গেছে। ফলে অবসর জীবন বা দ্বিতীয় বাড়ির জন্য ফ্লোরিডা এখন ধীরে ধীরে বিলাসী বাজারে পরিণত হচ্ছে।
এক নিয়ম সবার জন্য, ক্ষোভ অনেকের
অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার সঙ্গে ভেতরের নিরাপদ এলাকার কনডোগুলোকেও একই নিয়ম মানতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। কেউ কেউ বলছেন, মাসিক ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সেখানে থাকা আর সম্ভব নয়।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যপাল রন ডেস্যান্টিস কিছু সংস্কারের পক্ষে কথা বললেও, অনেক মালিক ইতিমধ্যেই ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কেউ কেউ ফ্লোরিডা ছেড়ে আবার উত্তরাঞ্চলের রাজ্যে ফিরে যাচ্ছেন।

দাম কি সত্যিই কমছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নির্মাণ আর অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে আগামী দিনে দামের বৃদ্ধি ধীর হতে পারে, কোথাও কোথাও সামান্য কমতেও পারে। তবে যেসব পরিবার ইতিমধ্যেই বাড়তি ঋণ আর খরচের চাপে পড়েছে, তাদের জন্য এই সামান্য পরিবর্তন যথেষ্ট নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় গবেষকদের মতে, ফ্লোরিডা এখন শুধু কেনার দামে নয়, রক্ষণাবেক্ষণের মোট খরচ হিসাব করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ বাড়ি কেনা মানে এখন পুরো একটি হিসাবনিকাশ কেনা।
বদলে যাওয়া মানসিকতা
আইনজীবী ও বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, মানুষ এখন আগের মতো শুধু সুন্দর বাড়ি দেখেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। তারা ভাবছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই বাড়ি ধরে রাখার খরচ কতটা সহনীয়। এই পরিবর্তিত মানসিকতাই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ফ্লোরিডার মধ্যবিত্ত স্বপ্ন আর আগের মতো সহজ নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















