মারাত্মক বারুদের ঝড়ে রাশিয়ার কৌশল বদল
চার বছরের কাছাকাছি সময় ধরে চলা যুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করে রাশিয়া এবার ইউক্রেনের ওপর সর্বাধিক তীব্র বিমান আক্রমণ চালিয়েছে। শতাধিক ড্রোন ও ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি মস্কো দুর্লভ ওরেশনিক হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছে, যা পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। কিয়েভের কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর আবাসিক ভবনগুলোর ওপর হামলায় অন্তত চারজন নিহত ও অনেক আহত হয়েছেন। আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবন থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের উদ্ধার করতে গিয়ে দমকল ও স্বেচ্ছাসেবকরা আহত হন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিছুটা শান্ত থাকা পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় যখন সাইরেন বেজে ওঠে এবং নাগরিকেরা গভীর বেসমেন্টে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
শান্তি আলোচনায় চাপ ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ
এই হামলা সাম্প্রতিক অবরোধে মস্কোর “প্রতিশোধ” দাবি করা যুক্তিকে তুলে ধরে; রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বাসভবনে কথিত ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার জবাব হিসেবে এই আক্রমণ করা হয়েছে। কিয়েভ ও ওয়াশিংটন এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে, এবং ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এটিকে উস্কানিমূলক প্রচারণা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও ইউক্রেন‑ন্যাটো কাউন্সিলের জরুরি সভা ডাকার আহ্বান জানান, কারণ ইউরোপীয় সীমানার কাছাকাছি এমন হাইপারসনিক মিসাইল ব্যবহার মহাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। হামলায় কাতারের দূতাবাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দোহার নিন্দা ও কূটনৈতিক ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
পশ্চিম ইউক্রেনের লভিভ অঞ্চলে বিশাল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যেখানে একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ গ্যাস গুদাম রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। রাশিয়া লক্ষ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য না দিলেও দেশটির সামরিক ব্লগাররা ধারণা করছেন, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো নষ্ট করা ছিল উদ্দেশ্য। শীতকালে শক্তি সংকটের মধ্যে এমন হামলা মানুষের মনোবল ভেঙে দিতে পারে। কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিৎসকো সতর্ক করে বলেছেন, বরফাচ্ছন্ন রাস্তা ও বিদ্যুৎ সংকটের সুযোগ নিয়ে রাশিয়া সর্বোচ্চ আতঙ্ক ছড়াতে চাচ্ছে। রাজধানীর কিছু অংশে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে, মানুষ ঠান্ডায় কাঁপছে।

এদিকে, এই বিস্ফোরণ ইউক্রেনের মিত্রদের কাছে আধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়ার দাবি আরও জোরালো করেছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, হামলাটি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার ঘাটতি দেখিয়েছে; তাই উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নেতারা সংহতি প্রকাশ করলেও যুদ্ধ আরও উসকে দেওয়ার আশঙ্কায় নতুন সহায়তার ঘোষণা দেননি। হামলা এমন সময়ে হয়েছে যখন গোপন শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির খবর মিলছিল; এতে মস্কোর আপোস না করার মনোভাব স্পষ্ট হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, হাইপারসনিক মিসাইল ব্যবহার যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
সাধারণ ইউক্রেনীয়দের কাছে এই আক্রমণ আরেকটি ক্ষত। বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠা ভবনগুলো থেকে লোকজন তড়িঘড়ি নিচে নেমেছেন, জানালার কাচ ভেঙে পড়েছে, চারপাশে ধোঁয়া ছড়িয়েছে। একজন কিয়েভবাসী বলছেন, “আমরা সবাই শান্তি চাই, কিন্তু মস্কো শোনা যাচ্ছে না।” মানুষের ধৈর্য ও পারস্পরিক সহায়তা এটাই প্রমাণ করে যে, সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্রের ভয়েও তাদের মনোবল ভাঙা যায়নি। শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংঘাত থামার সম্ভাবনা নেই; বরং প্রতিটি নতুন মিসাইল হামলার সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বিস্তার লাভ করার ঝুঁকি বাড়ছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















