ওয়াশিংটন—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, বিক্ষোভ দমনে ইরানের কঠোর অভিযানে প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তেহরান এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়। মানবাধিকারকর্মীদের হিসাব অনুযায়ী, চলমান দমন-পীড়নে অন্তত ছয়শো ছেচল্লিশ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে এ মন্তব্যের আগে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী—যিনি দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগের মধ্যস্থতাকারী—সপ্তাহান্তে ইরান সফর করেন। তবু আলোচনায় ইরান ঠিক কী প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, তা স্পষ্ট নয়। কারণ ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার নিয়ে কঠোর শর্ত আরোপ করেছেন, যা তেহরান নিজেদের জাতীয় প্রতিরক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে দাবি করে।
কূটনীতির দরজা খোলা রাখার দাবি তেহরানের
তেহরানে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। তিনি সহিংসতার জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন, যদিও কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে হস্তক্ষেপের অজুহাত দিতে বিক্ষোভকে ইচ্ছাকৃতভাবে সহিংস করা হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে আরাঘচি জানান, ইরান কূটনীতির পথ খোলা রাখতে চায়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের একটি চ্যানেল খোলা রয়েছে। তবে যেকোনো আলোচনা হতে হবে পারস্পরিক স্বার্থ ও উদ্বেগের স্বীকৃতির ভিত্তিতে, একতরফা নির্দেশনা বা চাপের মাধ্যমে নয়।
সরকারপন্থী সমাবেশ ও কঠোর হুঁশিয়ারি
সোমবার ইরানে সরকারপন্থী সমাবেশে রাস্তায় নেমে আসে বিপুল জনতা। কয়েক দিনের টানা বিক্ষোভের পর এটি ছিল ধর্মতান্ত্রিক শাসনের শক্তি প্রদর্শন। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে প্রচারিত দৃশ্যে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়।
ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের ‘ঈশ্বরের শত্রু’ হিসেবে গণ্য করা হবে, যা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্য ও সামরিক বিকল্প
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কারোলিন লেভিট জানান, প্রকাশ্যে ইরানের বক্তব্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক দিনে গোপনে পাঠানো বার্তার পার্থক্য রয়েছে। তাঁর ভাষায়, প্রেসিডেন্ট এসব বার্তা যাচাইয়ে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনে সামরিক বিকল্প ব্যবহারে তিনি পিছপা হবেন না।
ট্রাম্প ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দল ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছেন। এর মধ্যে সাইবার হামলা থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সরাসরি হামলার বিষয়ও রয়েছে। রবিবার রাতে ট্রাম্প বলেন, ইরান পাল্টা হামলার চেষ্টা করলে এমনভাবে আঘাত করা হবে, যা তারা আগে কখনো দেখেনি।
বাণিজ্যিক চাপ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত
সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যারা ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করবে তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র পঁচিশ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ঘোষণায় তিনি জানান, সিদ্ধান্তটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা ব্রাজিল, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ও তথ্য অন্ধকার
দুই সপ্তাহের বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত দশ হাজার সাতশোর বেশি মানুষ আটক হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্য। তাদের হিসাবে নিহতদের মধ্যে পাঁচশো বারোজন বিক্ষোভকারী ও একশো চৌত্রিশ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। ইন্টারনেট বন্ধ ও ফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার কোনো সামগ্রিক হতাহতের হিসাব দেয়নি।
বিদেশে থাকা ইরানিরা আশঙ্কা করছেন, এই তথ্য অবরোধ নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরপন্থীদের আরও সহিংস করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে নতুন বিক্ষোভের ইঙ্গিত মিললেও তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
তেহরানে ভয়ের ছায়া
রাজধানী তেহরানে সন্ধ্যার আজানের পর থেকেই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। রাতের নামাজের সময় শহর প্রায় জনশূন্য থাকে। দমন-পীড়নের ভয়েই এমন পরিস্থিতি বলে জানান এক প্রত্যক্ষদর্শী। পুলিশের পাঠানো বার্তায় জনগণকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বিক্ষোভে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দা শাখার নামেও পাঠানো বার্তায় বিক্ষোভে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকট থেকে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
গত আটাশ ডিসেম্বর ইরানি মুদ্রা রিয়ালের তীব্র পতনের মধ্য দিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান নেমে গেছে নজিরবিহীন পর্যায়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন ধর্মতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধেও সরাসরি চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















