মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কড়াকড়ি অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে পশ্চিম আফ্রিকার বহু মানুষকে নিজ দেশ নয়, তৃতীয় দেশ হিসেবে ঘানায় পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু ঘানায় পৌঁছানোর পর তাদের সেখানেও আশ্রয় মিলছে না। বরং অভিযোগ উঠেছে, ঘানা কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে এসব মানুষকে জোর করে নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে দিচ্ছে, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে নিপীড়ন, নির্যাতন কিংবা মৃত্যুভয়। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ঘানায় পাঠিয়ে ফের জোরপূর্বক ফেরত
গত বছরের জুলাই মাসে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ সিয়েরা লিওনের নাগরিক রাবিয়াতু কুয়াতেহকে আটক করে। তিনি আদালতে আবেদন করে জানান, নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হলে রাজনৈতিক কারণে তার ওপর নির্যাতন হতে পারে। একজন বিচারক তার আবেদন মঞ্জুরও করেন। কিন্তু নভেম্বরে তাকে হঠাৎ করেই সিয়েরা লিওনে নয়, তৃতীয় দেশ হিসেবে ঘানায় পাঠানো হয়। সেখানে একটি হোটেলে ছয় দিন আটকে রাখার পর জোর করে আবার সিয়েরা লিওনে ফেরত পাঠানো হয় বলে অভিযোগ তার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, সবুজ ও কালো পোশাক পরা কয়েকজন ব্যক্তি তাকে টেনে-হিঁচড়ে একটি ভ্যানে তুলছেন। তিনি চিৎকার করে বলছেন, তিনি যেতে চান না। এই ভিডিও ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

তৃতীয় দেশে পাঠানোর বিতর্ক
রয়টার্সের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অন্তত ৩০ জন পশ্চিম আফ্রিকান নাগরিককে ঘানায় পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে অন্তত ২২ জনকে ঘানা পরে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আদালত আগেই তাদের নিজ দেশে না পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল। আইনজীবীরা বলছেন, ঘানার এই প্রক্রিয়া ছিল নিয়মিত ও পরিকল্পিত, যেখানে কাউকেই আইনি আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি।
শুধু ঘানা নয়, মধ্য আফ্রিকার দেশ ইকুয়েটোরিয়াল গিনিও একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো কয়েকজনকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই তথ্য আগে প্রকাশ্যে আসেনি।
মানবাধিকার ও আইনি প্রশ্ন
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় দেশ ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন এড়িয়ে যাচ্ছে। যেসব দেশে কাউকে পাঠানো হচ্ছে, সেসব দেশ যদি নিরাপদ আশ্রয় না দেয়, তবে এটি প্রত্যাবর্তন নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন অধিকার ক্লিনিকের পরিচালক এলোরা মুখার্জি বলেন, কোনো তৃতীয় দেশ যদি মানুষকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিরুদ্ধে কার্যকর আপত্তির সুযোগ না দেয়, তবে সেটিকে নিরাপদ বলা যায় না।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দপ্তর দাবি করছে, ঘানা ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনিতে পাঠানো সবাই অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে তারা কোথায় যাচ্ছেন, সে দায় যুক্তরাষ্ট্র নিতে চায় না।
ঘানার ভূমিকা ও নীরবতা
ঘানা সরকার প্রথমে জানিয়েছিল, তারা কেবল অপরাধমূলক রেকর্ডহীন পশ্চিম আফ্রিকানদের নেবে এবং মানবিক কারণেই এই সিদ্ধান্ত। তবে পরবর্তীতে জানা যায়, অভিবাসন সহযোগিতার বিনিময়ে ভিসা সহজীকরণ ও শুল্ক ছাড়ের সম্ভাবনাও আলোচনায় ছিল। যদিও এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে অভিবাসন চুক্তির সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করা যায়নি।
রাবিয়াতু কুয়াতেহের ঘটনার পর ঘানা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্তের ঘোষণা দিলেও এখনো তার ফল প্রকাশ করা হয়নি।
পরিবার, ভয় আর অনিশ্চয়তা
রয়টার্সের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কুয়াতেহ জানান, যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি নিজের দ্বিতীয় ঘর মনে করেন। তার প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মা সবাই সেখানে নাগরিক হিসেবে বসবাস করেন। হঠাৎ করে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য দেশে পালিয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে।

একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন দিয়াদি কামারা নামের এক যুবক। তিনি উত্তর আফ্রিকার এক দেশে বংশানুক্রমিক দাসত্ব থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাইছিলেন। আদালত তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে নিষেধ করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে ইকুয়েটোরিয়াল গিনিতে পাঠানো হয়। সেখান থেকেও তাকে ফের নিজ দেশে পাঠানো হয়। এখন তিনি আত্মগোপনে আছেন।
বিচার ও ভবিষ্যৎ প্রশ্ন
ওয়াশিংটনের এক ফেডারেল বিচারক ঘানার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তিকে আইনি শর্ত এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও এখতিয়ারগত কারণে তিনি সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারেননি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর দাবি করেছে, ঘানা থেকে নিশ্চয়তা নেওয়া হয়েছে যে কাউকে নির্যাতনের মুখে পাঠানো হবে না। বাস্তবে যা ঘটছে, তা সেই নিশ্চয়তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে তৃতীয় দেশ ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















