যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক কমানো ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সমঝোতার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে তাইওয়ান। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী চেং লি-চুন জানিয়েছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের উচ্চপ্রযুক্তি সহযোগিতা নতুন মাত্রা পাবে এবং ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন্দ্রিক শিল্পে যৌথ শক্তি গড়ে উঠবে।
ওয়াশিংটনে সংবাদ সম্মেলনে চেং লি-চুন বলেন, এই আলোচনায় দুইমুখী উচ্চপ্রযুক্তি বিনিয়োগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্র যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হতে পারে। বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত হওয়া এই বাণিজ্য সমঝোতায় তাইওয়ানের বহু পণ্যে শুল্ক কমানো হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগের পথ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও সেমিকন্ডাক্টর বাস্তবতা
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই সেমিকন্ডাক্টরের বড় উৎপাদক হিসেবে তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রে আরও বিনিয়োগ প্রত্যাশা করে আসছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত চিপ উৎপাদনে দেশটির ভূমিকা বাড়াতে চাইছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিক জানিয়েছেন, তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রে সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে প্রায় আড়াই লক্ষ কোটি ডলারের বিনিয়োগ করবে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে একটি বড় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এক লক্ষ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সহজ করতে আরও আড়াই লক্ষ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়েছে।
চীনের আপত্তি ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই সমঝোতা চীনের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের বিরোধিতা করে। অন্যদিকে তাইওয়ান স্পষ্টভাবে চীনের সার্বভৌমত্ব দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র যদিও তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখে না, তবু দেশটি তাইওয়ানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমর্থক ও অস্ত্র সরবরাহকারী।

বিনিয়োগের ধরন ও সরবরাহ শৃঙ্খল
চেং লি-চুন এই চুক্তিকে উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রে তাইওয়ানের বিনিয়োগ বাড়াবে না, বরং তাইওয়ানে মার্কিন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। তার ভাষায়, এটি কারখানা সরিয়ে নেওয়ার বিষয় নয়, বরং নতুন করে নির্মাণের প্রক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি তাইওয়ানের প্রযুক্তি শিল্পের সম্প্রসারণও চলবে।
তাইওয়ানের অর্থনীতিমন্ত্রী কুং মিং-শিন জানান, এই বিনিয়োগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সার্ভার ও জ্বালানি খাতেও বিস্তৃত হবে। তবে চিপ খাতে নির্দিষ্ট অঙ্ক প্রকাশ করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোই।
বাজার প্রতিক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞ মত
এই সমঝোতার ইতিবাচক প্রভাবে তাইওয়ানের শেয়ারবাজার শুক্রবার রেকর্ড উচ্চতায় বন্ধ হয়েছে। শক্তিশালী আয় ও শুল্ক সুবিধা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। তাইওয়ান অর্থনৈতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের সভাপতি চাং চিয়েন-ই বলেন, চিপ ও সংশ্লিষ্ট পণ্যে সবচেয়ে সুবিধাজনক মর্যাদা পাওয়া প্রথম দেশ হিসেবে তাইওয়ানকে প্রকাশ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে স্পষ্ট, ওয়াশিংটন তাইওয়ানকে সেমিকন্ডাক্টর খাতে মূল কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে।
চিপ শিল্পের ভবিষ্যৎ ও সংসদীয় চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের শীর্ষ উন্নত চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের মধ্যে শক্তিশালী বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা কে স্বাগত জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, বাজারের চাহিদা ও গ্রাহকের প্রয়োজনের ভিত্তিতেই সব বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশে সম্প্রসারণ চলবে।
চুক্তিটি কার্যকর করতে হলে তাইওয়ানের সংসদের অনুমোদন লাগবে। বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তারা চিপ শিল্প ফাঁপা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লক্ষ্য হলো তাইওয়ানের মোট চিপ সরবরাহ শৃঙ্খলের উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে তোলা। তবে তাইওয়ানের হিসাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে উন্নত চিপ উৎপাদনের বড় অংশই দেশেই থাকবে।
উপপ্রধানমন্ত্রী চেং লি-চুনের মতে, এই উদ্যোগ তাইওয়ান–যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বৈচিত্র্য বজায় রাখাও জরুরি, কারণ ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাজার যুক্তরাষ্ট্রেই কেন্দ্রীভূত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















