ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন কারাগারের সামনে এখন প্রতিদিনই জড়ো হচ্ছেন উৎকণ্ঠিত স্বজনেরা। সরকারের ঘোষণা এসেছে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির, কিন্তু বাস্তবে সেই মুক্তি হচ্ছে হাতে গোনা কয়েকজন করে। ফলে আশার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে অপেক্ষা আর দুশ্চিন্তা।
প্রতিশ্রুত মুক্তি, বাস্তবে ধীরগতি
গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলা সরকার জানায়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে। জাতীয় পরিষদের শীর্ষ নেতা জর্জ রোদ্রিগেজ একে ‘গণমুক্তি’ বললেও কাদের কখন ছাড়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। কারা কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী এখন পর্যন্ত একশ ছেষট্টি জন মুক্তি পেয়েছেন। তবে মানবাধিকার সংগঠন ফোরো পেনালের হিসাব বলছে, নিশ্চিত মুক্তির সংখ্যা তার চেয়ে অনেক কম। এই ফারাক বন্দিদের পরিবারের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রতারণার ফাঁদে গ্রেপ্তার, মাসের পর মাস বন্দিজীবন
নেলিদা সানচেজের গ্রেপ্তারের ঘটনা এখন ভেনেজুয়েলায় দমননীতির প্রতীক। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ভুয়া খবর দিয়ে তাঁকে হাসপাতালে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছাতেই গোপন পুলিশ তাঁকে গাড়ি থেকে টেনে নিয়ে যায়। ষোল মাসের বেশি সময় ধরে তিনি এল হেলিকোইদে বন্দি, যে কারাগার মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষায় নির্যাতনকেন্দ্র।
মা নেলিদা দে ভেনেজুয়েলায় প্রতিদিন অপেক্ষা করেন একটি ফোনকলের। তাঁর ভাষায়, জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সময় কাটছে এই অপেক্ষায়।

কারাগারের বাইরে রাত্রিযাপন
মিরান্ডা প্রদেশের এক কারাগারের বাইরে গাড়িতেই রাত কাটাচ্ছেন এলিয়ানা পাচেকো। তাঁর স্বামী ফেলিক্স পেরদোমো একজন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী। গুরুতর কিডনি সমস্যায় ভুগলেও তিনি এখনো বন্দি। অভিযোগ, সামাজিক মাধ্যমে সরকারের সমালোচনামূলক একটি ভিডিও পুনরায় শেয়ার করার কারণে তাঁকে উস্কানি ও সন্ত্রাসবাদের মামলায় আটক করা হয়েছে।
পাচেকোর কণ্ঠে ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব স্পষ্ট। তিনি বলছেন, তাঁর স্বামী কোনো অপরাধী নন, অথচ দীর্ঘদিন ধরে বন্দি।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ থেকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ
নেলিদা সানচেজ ছিলেন পরিচিত নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের মাধ্যমে তিনি হাজারো পর্যবেক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর সরকার তাঁকে অবৈধ সংগঠন, ঘৃণা উসকানি, ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত করে।
তাঁর মেয়ে দানেলি হার্নান্দেজ এখন বিদেশে থাকলেও মায়ের মুক্তির সম্ভাবনায় আঁকড়ে ধরে আছেন।
ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়
ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক বন্দিদের ভবিষ্যৎ এখনও অস্পষ্ট। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বন্দির সংখ্যা আটশ থেকে নয়শর মধ্যে। প্রশাসনের শীর্ষ পরিবর্তন হলেও দমনযন্ত্র অনেকটাই অক্ষত। বহু পর্যবেক্ষকদের মতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর হাতেই এখনো কারাগারের চাবি।
সন্তানের থেকে বিচ্ছেদ, শেষ পর্যন্ত মুক্তি
সাংবাদিক নাকারি মেনা গত বছর স্বামীসহ গ্রেপ্তার হন। রাজধানীতে অপরাধ বৃদ্ধির খবর প্রকাশের পর তাঁদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়। সবচেয়ে কষ্টকর ছিল ছয় বছরের মেয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ। কারাগার থেকে আঁকা ছবি আর চিঠি পাঠিয়ে সন্তানের ঘর সাজিয়েছিলেন তিনি।
অবশেষে বুধবার নাকারি মেনা ও তাঁর স্বামী মুক্তি পেয়েছেন। এই খবর অন্য পরিবারগুলোর মধ্যেও নতুন করে আশা জাগিয়েছে, যদিও অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















