দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ক্যানোলা নিয়ে শুল্ক নাটকীয়ভাবে কমানোর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কানাডা ও চীন। দুই দেশের এই প্রাথমিক বাণিজ্য সমঝোতাকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বেইজিং সফরে গিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানান, শুল্ক কমানোর মধ্য দিয়ে দুই দেশই বাণিজ্য বাধা ভেঙে নতুন কৌশলগত সম্পর্কের পথে হাঁটতে চায়।
বৈদ্যুতিক গাড়িতে বড় পরিবর্তন
নতুন সমঝোতা অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে চীন থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে অনুমতি দেবে কানাডা। এসব গাড়ির ওপর শুল্ক নির্ধারিত হয়েছে তুলনামূলকভাবে কম হারে। এতে করে আগের কঠোর নীতির অবসান ঘটছে। কয়েক বছর আগে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর যে কঠোর শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, সেটি তুলে নেওয়ার মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতা ও বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
মার্ক কার্নির মতে, এই সিদ্ধান্ত সাম্প্রতিক বাণিজ্য উত্তেজনার আগের অবস্থায় ফেরার ইঙ্গিত দেয়, তবে এবার এমন এক চুক্তির আওতায় যা কানাডিয়ান অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুফল বয়ে আনবে। তিনি বলেন, নিজস্ব বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে উদ্ভাবনী অংশীদারদের কাছ থেকে শেখা, তাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া এবং দেশীয় চাহিদা বাড়ানো জরুরি।

চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা
চুক্তির ফলে কানাডার গাড়ি শিল্পে উল্লেখযোগ্য চীনা বিনিয়োগ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, এতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিভিত্তিক ভবিষ্যতের দিকে কানাডার অগ্রযাত্রা দ্রুততর হবে। পাশাপাশি জ্বালানি সংরক্ষণ ও উৎপাদন খাতে চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

কৃষি খাতে স্বস্তির বার্তা
বৈদ্যুতিক গাড়ির পাশাপাশি কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। এর আগে শুল্ক বিরোধের জেরে ক্যানোলা তেল, ক্যানোলা মিলসহ একাধিক কানাডিয়ান কৃষিপণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিল চীন। নতুন সমঝোতায় সেই শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রত্যাশা করছে অটোয়া।
কানাডার ধারণা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্যানোলা বীজের ওপর শুল্ক অনেকটাই কমে আসবে, যা বর্তমান উচ্চ হারের তুলনায় বড় স্বস্তি দেবে। ক্যানোলা বাজার কানাডার জন্য বহু বিলিয়ন ডলারের হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্যানোলা মিল, লবস্টার, কাঁকড়া ও মটরশুঁটির মতো পণ্যের ওপর বৈষম্যমূলক শুল্কও প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।

রপ্তানি বাড়ার আশা
সরকারি হিসাবে এই চুক্তির ফলে কৃষক, মৎস্য আহরণকারী ও প্রক্রিয়াজাতকারী উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নতুন রপ্তানি আদেশ পেতে পারেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে নতুন গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে ক্ষতি হয়েছিল, এই সমঝোতা তার একটি বড় অংশ পুষিয়ে দিতে পারে।
জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতা
যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের অর্থনৈতিক ও আর্থিক সংলাপ পুনরায় শুরু করার অঙ্গীকার করেছে। কৃষি, তেল, গ্যাস ও সবুজ জ্বালানিতে সহযোগিতা জোরদারের কথাও বলা হয়েছে। কানাডা আগামী দেড় দশকে বিদ্যুৎ গ্রিড সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে এবং সেখানে চীনা বিনিয়োগের সুযোগ দেখছে সরকার। সমুদ্রভিত্তিক বায়ুশক্তিসহ বিভিন্ন খাতে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে।
এছাড়া এশিয়ার বাজারে তরলীকৃত গ্যাস রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মার্ক কার্নি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস উৎপাদন করে তা এশিয়ার বাজারে সরবরাহ করার লক্ষ্য নিয়েছে কানাডা।

যুক্তরাষ্ট্র প্রসঙ্গ ও কূটনৈতিক বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে জটিলতা বাড়ায় কানাডা এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বেশি আগ্রহী। যদিও নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিক থেকে অটোয়া এখনও ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র, তবু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাস্তববাদী নীতি গ্রহণের ইঙ্গিত মিলছে। মার্ক কার্নি নিজেও বলেছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও পূর্বানুমান যোগ্য ও ফলপ্রসূ হয়েছে।
বৈশ্বিক প্রভাবের ইঙ্গিত
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কানাডা ও চীনের এই ঘনিষ্ঠতা বৈশ্বিক বাণিজ্য রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বিচ্ছিন্নতার নীতি যে সর্বত্র সমর্থন পায়নি, এই সমঝোতা তার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে পারে বেইজিং। তবে একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট করা হচ্ছে, কানাডা তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থান থেকে হঠাৎ সরে আসছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















