হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের এক বছর পূর্ণ হতেই আমেরিকার রাজনীতি ও সমাজে পরিবর্তনের স্পষ্ট ছাপ দেখা যাচ্ছে। জনপরিসরের ভাষা বদলেছে, বিতর্কে ফিরেছে সরাসরি কথা বলার প্রবণতা, আর বহু মানুষ আবারও মনে করছেন—ওয়াশিংটনে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হচ্ছে। টেলিপ্রম্পটার বা লিখিত বক্তব্য ছাড়াই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি সেই পরিবর্তনেরই প্রতীক।
মুক্ত বক্তব্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা
ট্রাম্পের প্রথম বছরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে মুক্ত বক্তব্যকে আবারও নাগরিক মূল্যবোধের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা। আগের সময়ে বহু আমেরিকান মনে করতেন, ভিন্নমত প্রকাশ করা ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারি বয়ান প্রশ্ন করলে অনেককে বর্ণবাদী, চরমপন্থী কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী বলে দাগিয়ে দেওয়া হতো। হুইসেলব্লোয়ার ও স্বাধীন কণ্ঠগুলোকে নীরব করার প্রবণতাও ছিল স্পষ্ট। এখন হোয়াইট হাউস আবার উন্মুক্ত বিতর্কের জায়গা, যেখানে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করছেন এবং প্রেসিডেন্ট সরাসরি জবাব দিচ্ছেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব নাগরিকদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ ভাঙার কৌশল
ট্রাম্প বরাবরই বুঝেছেন, গণমাধ্যমের প্রভাব আসে বয়ান নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থেকে। তাই তিনি প্রচলিত গেটকিপার এড়িয়ে সমাবেশ, সরাসরি সাক্ষাৎকার ও বিকল্প প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছেন। এতে ভোটারদের প্রাপ্তবয়স্ক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে সম্মান জানানো হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী অনেক গণমাধ্যম এই নিয়ন্ত্রণ হারাতে অসন্তুষ্ট হলেও এখন আর বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন নির্বিঘ্নে চালানো সহজ নয়। তথ্য বিকৃতি হলে তাৎক্ষণিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে, আর জবাবদিহিও বাড়ছে।

বিদেশনীতি ও কূটনীতিতে আত্মবিশ্বাস
বাইডেন প্রশাসনের সময়টায় পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবনার সুযোগ পেয়েছিলেন ট্রাম্প—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার মতো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সবকিছু এক বছরে সম্ভব না হলেও, আমেরিকান কূটনীতিতে আবার আত্মবিশ্বাসের ছাপ ফিরেছে। ক্ষমাপ্রার্থনার বদলে দৃঢ় অবস্থানই এখন বার্তা।
দেশপ্রেম ও পরিচয়ের প্রত্যাবর্তন
এই আত্মবিশ্বাস দেশপ্রেমের নতুন জাগরণ ঘটিয়েছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এখন কেবল স্লোগান নয়, বরং দেশের প্রতি ভালোবাসাকে স্বাভাবিক ও ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে দেখার আহ্বান। জাতীয় মেজাজে পরিবর্তন এসেছে—নিজস্ব ইতিহাস ও পরিচয় নিয়ে সংকোচের জায়গা দখল করেছে গর্ব ও যৌথ লক্ষ্যবোধ।
অর্থনীতি ও মধ্যবিত্তের প্রত্যাবর্তন
অর্থনৈতিক নীতিও এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে। ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’ টিপস ও অতিরিক্ত সময়ের আয়ের ওপর কর কমিয়ে দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ন্যায্য বাণিজ্যভিত্তিক কর্মসংস্থান নীতি দেশীয় শিল্প ও শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দীর্ঘদিন অবহেলিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আবার জাতীয় আলোচনায় ফিরেছে।
সরকারি জবাবদিহি ও জননিরাপত্তা
সরকারি অপচয় ও জালিয়াতি চিহ্নিত করতে সরকারি দক্ষতা দপ্তর গঠনকে অনেকেই দেখছেন আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ হিসেবে। লক্ষ্য জনসেবা ভেঙে ফেলা নয়, বরং নাগরিকদের সেবায় সরকারের ভূমিকা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ন্যাশনাল গার্ডের সহায়তায় জননিরাপত্তা জোরদার হয়েছে। কাজ ও মর্যাদা ফিরলে অপরাধ কমে—এই ধারণাই নীতির ভিত্তি।
বিরোধিতা ও গণতান্ত্রিক বিতর্ক
বিরোধীদের প্রতিরোধ থামেনি। সরকার বন্ধের ঘটনাও দেখিয়েছে, অগ্রগতি থামাতে কতদূর যেতে প্রস্তুত কেউ কেউ। তবে সাধারণ মানুষ এটিকে রাজনৈতিক অন্তর্ঘাত হিসেবেই দেখেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, তীব্র সমালোচকরাও এখন প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। সেন্সরশিপ নয়, উন্মুক্ত আলোচনাই খারাপ ধারণার মোকাবিলার পথ—এই বিশ্বাসই নতুন করে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।
Sarakhon Report 


















