নির্দয় দমন ও মৃত্যুর হিসাব
ইরানের ভিতরে দুই বছরের গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রটিকে একটি ভয়ানক মাইলফলকে নিয়ে গেছে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএনএ জানিয়েছে যে জ্বালানি দামের বৃদ্ধি, নৈতিকতা পুলিশ হেফাজতে এক তরুণীর মৃত্যুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং আর্থিক ন্যায়বিচারের দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। সংস্থাটি আইনজীবী ও স্বেচ্ছাসেবীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে ৩,০৯০টি মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করেছে; এদের মধ্যে অধিকাংশই বিক্ষোভকারী, প্রায় দুইশ’ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং প্রচুর নারী ও কিশোর। আট দিন ধরে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড বন্ধ রাখার পর এখন সংযোগ ধীরে ধীরে ফিরছে, কিন্তু খুজেস্তানসহ অনেক প্রদেশে ইন্টারনেট এখনও দুর্বল, যার ফলে স্বজন বা আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিঘ্নিত হচ্ছে।
![]()
সরকারি কর্মকর্তা ও বিপ্লবী রক্ষীরা আন্দোলনকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে প্রমাণিত করতে চায়। তারা দাবি করে যে বড় শহরের সংঘর্ষে সশস্ত্র উসকানিদাতারা প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছে। সরকারি প্রচারমাধ্যম বলছে যে নিরাপত্তা বাহিনী নন‑লেথাল অস্ত্র ব্যবহার করছে এবং কয়েকশ’ উসকানি গ্রেপ্তার হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য মতে গ্রেপ্তার সংখ্যা ১,৫০০, কিন্তু তারা দাবি করেন যে বাহিনী ভিড়ের দিকে সরাসরি গুলি ছোড়েনি। কিন্তু অধিকার সংস্থাগুলোর নথি ও ভিডিও প্রমাণে দেখা যায় যে শহরগুলোতে আধাসামরিক বাহিনী শটগান, টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করেছে এবং রাতে গ্রামে অভিযান চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে এটাই সবচেয়ে কঠোর দমন; গোপন আদালতে শত শত মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে, এবং রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগ ‘পৃথিবীতে দুর্নীতি’ অভিযোগে আটক বিক্ষোভকারীদের জন্য গণ ফাঁসির ব্যবস্থা করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সংস্কারের সম্ভাবনা
এই মৃত্যুসংখ্যার খবরে বিশ্বব্যাপী নিন্দা প্রকাশ করা হলেও বিদেশি সরকারগুলো কীভাবে সাড়া দেবে, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেছেন যে ইরান সরকার কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীকে ফাঁসি দিয়েছে, যা কিছু গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে এবং বর্তমান প্রশাসনের জন্য নতুন পারমাণবিক চুক্তির সমর্থন গড়ে তোলা কঠিন করে তুলেছে। ইউরোপীয় নেতারা ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন, কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত কোনো নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক চাপের পরিকল্পনা দেননি। মানবাধিকার কর্মীরা একটি বহুপাক্ষিক তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি শর্ত করার আহ্বান জানাচ্ছেন।

দেশের ভেতরে বেশ কিছু আলেম ও সংস্কারপন্থী আশঙ্কা করেন যে আরও কঠোর দমন জনগণের আস্থা আরও কমাতে পারে। তারা বলছেন যে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, দায়ী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা ইত্যাদি সীমিত সংস্কার সাময়িক স্থিতিশীলতা আনতে পারে। অন্যরা চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক আন্দোলনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, কিছু সরকার জনগণের দাবির প্রতি নমনীয়তা দেখিয়ে ক্ষমতা ধরে রেখেছে। ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। বিশ্লেষকদের ধারণা, অর্থনীতি ও উত্তরাধিকার নিয়ে শীর্ষ মহলে বিতর্ক তীব্র হয়েছে এবং পরবর্তী নেতা হয়তো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য পশ্চিমের সঙ্গে সমঝোতায় আগ্রহী হতে পারেন। আপাতত, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, আর বিরোধীদলীয় নেতারা ক্ষোভকে সমন্বিত রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করতে সংগ্রাম করছেন।
প্রবাসী ইরানি সমাজেও এ পরিস্থিতি বিভাজন সৃষ্টি করেছে। বিদেশে বসবাসকারী অনেকে আহতদের চিকিৎসা ও আইনি সহায়তার জন্য তহবিল গঠন করছেন, অভিবাসী পরিবারদের পাশে থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। অনেক পরিবার তাদের নিখোঁজ আত্মীয়দের সন্ধানে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তা চাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যা ইরানে বারবার বন্ধ হয়ে যায়, এখন প্রতিবাদের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ও ভ্রমণ‑নিরুৎসাহিত করার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে মন্দা, প্রজন্মগত হতাশা ও দমন‑পীড়নের মিশ্রণ আগামী মাসগুলোতে পুনরায় বিক্ষোভের জন্ম দিতে পারে, এমনকি রাস্তায় জমায়েত কমে গেলেও। অধিকারকর্মীরা বলছেন যে গোপন কবর ও পরিবারের নীরবতার কারণে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশিত সংখ্যার চেয়েও বেশি হতে পারে। এই সহানুভূতিশীল আন্দোলন সামনের বছরগুলোতে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















