উচ্চ ক্ষমতার হাইব্রিড ও বিলাসবহুল গাড়ি
বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি দ্রুত বাড়ছে, আর ২০২৬ সাল নতুন কয়েকটি প্রযুক্তিকে সামনে আনবে। বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো এখন বিদ্যুৎচালিত ও হাইব্রিড গাড়ির মাধ্যমে কেবল দক্ষতা নয়, অপ্রতিরোধ্য শক্তি প্রদর্শন করতে চায়। আস্টন মার্টিনের সীমিত সংস্করণের ভালহাল্লা হাইব্রিড মডেলটি একটি টুইন‑টার্বো ভি৮ ইঞ্জিন ও তিনটি বৈদ্যুতিক মোটর মিলিয়ে ১,০৬৪ অশ্বশক্তি ও সর্বোচ্চ গতি ৩৫০ কিলোমিটার/ঘণ্টা প্রদান করবে। মাত্র ৯৯৯টি গাড়ি তৈরি করা হবে এবং এটি তাদের ভ্যালকিরি হাইপারকারের বায়ুগতিবিদ্যা ও নকশা থেকে শিক্ষা নিয়েছে।
অডি প্রথমবারের মতো ফর্মুলা ওয়ানে হাইব্রিড প্রবর্তন করছে; আর২৬ গাড়িটির ৫০/৫০ গ্যাস‑ইলেকট্রিক পাওয়ারট্রেইন ১.৬ লিটার ইঞ্জিন ও তিনটি মোটর সমন্বয়ে প্রায় ১,০০০ অশ্বশক্তি উৎপাদন করবে। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের রোড গাড়িতেও ব্যবহৃত হবে এবং জ্বালানি ব্যবহারে ২০ শতাংশ সাশ্রয় করবে। বি এম ডব্লিউ‑এর নতুন নয়া ক্লাস প্ল্যাটফর্মে নির্মিত iX3 মডেল ৩০ শতাংশ বেশি শক্তি ঘনত্বের ব্যাটারি ব্যবহার করবে, যা ১০ মিনিটের চার্জে ২০০ মাইল রেঞ্জ যোগ করতে পারে এবং মোট ৫০০ মাইল পর্যন্ত যেতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন বৈদ্যুতিকরণে অনাগ্রহী ফেরারি ৮৮০‑ভোল্ট চার মোটর সমন্বিত ইলেট্রিকা মডেল নিয়ে আসছে, যাতে ১,০০০ অশ্বশক্তির বেশি শক্তি থাকবে এবং প্রাকৃতিক কম্পন কেবিনে পৌঁছে দিতে রেজোনেটর ব্যবহৃত হবে।

গণবাজারের মডেল ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
সব বৈদ্যুতিক গাড়ি সুপারকার নয়; চীনের গিলি গ্রুপ শহরের চালকদের জন্য কম্প্যাক্ট EX2 হ্যাচব্যাক আনছে। এই যানটি দুইটি ব্যাটারি বিকল্পে ১৯৩ থেকে ২৫৫ মাইল রেঞ্জ দেবে এবং সাশ্রয়ী দামের কারণে নতুন ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে এ ধরনের মডেল দেখায়, চীনা গাড়িনির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশীয় ব্যাটারি সরবরাহ ও উৎপাদন সুবিধা ব্যবহার করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে। ইতিমধ্যে বিওয়াইডি বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রয়ে টেসলাকে ছাড়িয়ে গেছে, আর গিলি, নিও ও এক্সপেং ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায় রপ্তানি বাড়াচ্ছে।
আসন্ন অন্য মডেলগুলোও বৈচিত্র্যে ভরপুর। হুন্ডাইয়ের পারফরম্যান্স বিভাগ আইওনিক ৬ এন স্পোর্ট সেডান তৈরি করছে, যা ৬৪১ অশ্বশক্তির মোটর, ড্রিফট মোড এবং ট্র্যাক‑ভিত্তিক সফটওয়্যার নিয়ে আসবে। মার্সেডিজ‑বেঞ্জ তাদের নতুন ইলেকট্রিক জিএলসি এসইউভিতে EQ ব্র্যান্ড নাম বাদ দিচ্ছে; গাড়িটি ফ্ল্যাগশিপ EQS সেডানের ব্যাটারি সিস্টেম ব্যবহার করবে এবং ৩০০ মাইলের বেশি রেঞ্জ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সময়ে, স্টার্টআপ ও পুরোনো নির্মাতারা সলিড‑স্টেট ব্যাটারি, ৮০০‑ভোল্ট স্থাপনা ও ইন্টিগ্রেটেড ড্রাইভ ইউনিটের পরীক্ষা করছে যাতে ওজন কমানো ও চার্জিং সময় কমানো যায়।

বৈদ্যুতিক গাড়ির উত্থান অঞ্চলভেদে একরকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক ক্রেতা এখনও রেঞ্জ ও চার্জিং নেটওয়ার্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন, এবং উচ্চ সুদের কারণে বিক্রি কমছে। ইউরোপ ও চীনের বাজার দ্রুত বাড়ছে কারণ সরকারী প্রণোদনা, শহরের দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাটারি খরচ কমে যাচ্ছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী এক‑পঞ্চমাংশ নতুন গাড়ি বিদ্যুৎচালিত হবে, যেখানে ২০২৩ সালে এই হার ছিল এক‑দশমাংশের কম। এই প্রতিযোগিতা গাড়ি নির্মাতাদের সফটওয়্যার কোম্পানির সঙ্গে জোট বাঁধতে এবং উন্নত চালক‑সহায়ক সিস্টেম, ওভার‑দ্য‑এয়ার আপডেট ও সাবস্ক্রিপশন বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে পণ্যকে আলাদা করতে বাধ্য করছে।
অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ভবিষ্যতের গাড়ি হবে ‘চলন্ত কম্পিউটার’; কারখানাগুলো তাই নিজস্ব সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম, বিনোদন ব্যবস্থা ও ক্লাউড পরিষেবা তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে কেবল বিদ্যুৎ বা হাইব্রিড গাড়ি বিক্রির লক্ষ্য স্থির করেছে, কারণ শূন্য নির্গমন গাড়ি ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানো কঠিন হবে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন। এসব লক্ষ্য পূরণে চার্জার স্থাপনা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং নির্মাণ কৌশল উন্নত করা জরুরি। ফলত ২০২৬ সালের মডেলগুলো প্রযুক্তির চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতিনিধিত্ব করবে। যেমন উচ্চ‑ক্ষমতাসম্পন্ন ভালহাল্লা ও ইলেট্রিকা গাড়িগুলো উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলছে, আর সাশ্রয়ী মডেলগুলো ক্রেতার পরিসর বৃদ্ধি করছে, তেমনি ২০২৬ সাল বৈদ্যুতিক পরিবহনের মূলধারায় পরিণত হওয়ার এক নির্ণায়ক মুহূর্ত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















