গ্রিনল্যান্ড বিক্রির চাপ তৈরি করতে ইউরোপের মিত্র দেশগুলোর ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকিতে এবার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জার্মান শিল্পখাত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অবস্থানকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জার্মানির শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প সংগঠনগুলো।
শুল্ক হুমকিতে ভেঙে যাচ্ছে বাণিজ্যিক স্থিতি
গত গ্রীষ্মে ব্রাসেলস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তির পর ব্যবসায়ীরা যে স্বস্তির পরিবেশ আশা করছিলেন, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকিতে তা ভেঙে পড়েছে। গ্রিনল্যান্ড বিক্রির অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর একের পর এক শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন তিনি। এতে জার্মান শিল্পে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রপ্তানিনির্ভর জার্মান অর্থনীতি এমনিতেই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। টানা দুই বছরের মন্দা কাটিয়ে উঠতে শুরু করলেও বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা জার্মান পণ্য, বিশেষ করে গাড়ি, যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক পণ্যের চাহিদাকে চাপে ফেলছে।

অযৌক্তিক দাবিতে উৎসাহ দেবে নতি স্বীকার
জার্মান প্রকৌশল শিল্পসংস্থা ভিডিএমএর সভাপতি বের্ট্রাম কাওলাথ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ইউরোপ যদি এবার নতি স্বীকার করে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অযৌক্তিক দাবি ও নতুন শুল্ক হুমকির পথ খুলে যাবে। তার মতে, রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত লক্ষ্য পূরণে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জার্মান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বৈদেশিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ফোলকার ট্রাইয়ারও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করার চেষ্টা ইউরোপের জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর জবাবের দাবি
জার্মান শিল্প ও বাণিজ্য মহল এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্যবদ্ধ ও শক্ত প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশা করছে। আলোচনায় এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কখনো ব্যবহার না হওয়া ‘অ্যান্টি কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট’, যা তৃতীয় কোনো দেশ নীতিগত চাপ সৃষ্টি করলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই হুমকি গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেনের সঙ্গে হওয়া প্রাথমিক সমঝোতাকেও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রস্তাবিত শুল্ক ছাড় চুক্তি নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এই মাসে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন জার্মান শিল্প নেতারা।

গাড়ি শিল্পে বড় ধাক্কা, বিলিয়ন ইউরো ক্ষতির আশঙ্কা
বর্তমানে কার্যকর মার্কিন শুল্ক ব্যবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী গড়ে পনের শতাংশ শুল্ক আরোপ হচ্ছে, তবে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো পণ্যে হার আরও বেশি। এই শুল্কের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে জার্মান গাড়ি শিল্পে, যা ইউরোপের সবচেয়ে বড় শিল্পখাত।
গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে জার্মানির রপ্তানি দাঁড়ায় প্রায় একশ পঁয়ত্রিশ বিলিয়ন ইউরো, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। তবুও যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হিসেবে রয়ে গেছে।
ভক্সওয়াগেন জানিয়েছে, শুধু গত বছরেই শুল্কের কারণে তাদের ক্ষতি হতে পারে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ইউরো। মার্সিডিজ বেঞ্জ, পোর্শে ও রাসায়নিক জায়ান্ট বিএএসএফও একই ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হুমকিতে
জার্মানির লোয়ার স্যাক্সোনি রাজ্যের শ্রমিক ইউনিয়ন নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, আরও বেশি শুল্ক আরোপ হলে ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া থমকে যেতে পারে। শিল্প মন্দার এই সময়ে বাড়তি চাপ কর্মসংস্থান ও ভোক্তা উভয়ের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
শ্রমিক সংগঠন আইজি মেটালের নেতা থরস্টেন গ্রোগার বলেন, এই ধরনের মার্কিন বাণিজ্যনীতি কোনো পক্ষেরই লাভ বয়ে আনে না। এতে আটলান্টিকের দুই পাশেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভোক্তা, শ্রমিক ও কোম্পানিগুলো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















