ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে ইউরোপজুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রাসী অবস্থান। ন্যাটো মিত্র ডেনমার্কের অধীন এই দ্বীপ দখলের হুমকি দিতে থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের আইনপ্রণেতারা।

ন্যাটো ও মিত্রতার গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা
গত সপ্তাহে কংগ্রেসে ন্যাটোর গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য দেন একাধিক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা। কেউ কেউ এমন আইন প্রস্তাব এনেছেন, যাতে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া ঠেকানো যায়। আবার কয়েকজন সিনেটর সরাসরি কোপেনহেগেনে গিয়ে ডেনিশ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। উদ্দেশ্য একটাই—পরিস্থিতির উত্তাপ কমানো এবং দীর্ঘদিনের মিত্রতার বন্ধন রক্ষা করা।
তবে এসব উদ্যোগ আদৌ যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। কারণ ট্রাম্প বারবারই দাবি করে চলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেবে। এতে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ডেলাওয়ারের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুনস বলেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তির প্রেসিডেন্ট যখন বারবার কোনো ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেন, তখন বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া যায় না।
ডেনমার্ক সফর ও কূটনৈতিক তৎপরতা
দ্বিদলীয় প্রতিনিধি দল নিয়ে ডেনমার্ক সফরের উদ্যোগ নেন সিনেটর কুনস। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস ও লিসা মারকাউস্কি। এই সফরের লক্ষ্য ছিল উত্তেজনা কমানো এবং আর্কটিক অঞ্চলে যৌথ সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া।
ওয়াশিংটনেও ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা। সেখানে নিরাপত্তা চুক্তি, খনিজ সম্পদ উন্নয়ন এবং সামরিক সহযোগিতার বিষয়গুলো উঠে আসে। ডেনিশ প্রতিনিধিরা স্পষ্ট করে জানান, গ্রিনল্যান্ডে চীন বা রাশিয়ার সক্রিয় উপস্থিতির কোনো প্রমাণ নেই।

ট্রাম্পের পাল্টা অবস্থান ও শুল্ক হুমকি
এসব কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যেই ট্রাম্প ভিন্ন সুরে কথা বলেন। তিনি ঘোষণা দেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে বিরোধিতার কারণে ইউরোপের আটটি দেশের পণ্যের ওপর ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দাবি করেন, আধুনিক অস্ত্রব্যবস্থার যুগে ভূখণ্ড ‘অধিগ্রহণ’ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রিপাবলিকানদের ভেতরের আপত্তি
প্রভাবশালী রিপাবলিকান নেতারা বলছেন, জোর করে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়টি বাস্তবসম্মত নয়। তবে তারা সরাসরি ট্রাম্পকে আক্রমণ করতেও এড়িয়ে চলছেন। সিনেটর টিলিস শুল্ক পরিকল্পনাকে যুক্তরাষ্ট্র, দেশটির ব্যবসা এবং মিত্রদের জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন।
সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন বলেছেন, কংগ্রেসে এমন কোনো পদক্ষেপের পক্ষে সমর্থন নেই। সাবেক রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককনেল সতর্ক করে বলেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা মিত্রদের আস্থা ভেঙে দেবে এবং ট্রাম্পের উত্তরাধিকারকে কলঙ্কিত করবে।

ন্যাটো ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন
আইনপ্রণেতাদের মতে, ডেনমার্কের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেই গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সুরক্ষার বাস্তবসম্মত পথ রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের বক্তব্যে ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ডেনমার্ককে সমর্থন জানাতে একাধিক দেশ ইতিমধ্যে গ্রিনল্যান্ডে সেনা পাঠিয়েছে।
সিনেটর মারকাউস্কি বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মনোযোগ দিতে গিয়ে ন্যাটো মিত্রদের শক্তি ও সম্পদ বিভক্ত হচ্ছে, যা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের স্বার্থকেই এগিয়ে দিচ্ছে।
কংগ্রেসের হাতে কী বিকল্প আছে
কংগ্রেস সদস্যরা ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ ঠেকাতে বিভিন্ন আইনি পথ খুঁজছেন। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয়েই এমন আইন আনতে চাইছেন, যাতে ন্যাটো সদস্য কোনো দেশের ভূখণ্ডে তাদের সম্মতি ছাড়া সামরিক অভিযান চালাতে প্রতিরক্ষা দপ্তরের অর্থ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।
এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের আরোপিত শুল্ক বাতিলের উদ্যোগও আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব প্রস্তাব কার্যকর করতে হলে হোয়াইট হাউসের সমর্থন বা প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, যা সহজ নয়।
ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমতি নিতে বাধ্য করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও রিপাবলিকান নেতৃত্ব যুক্তি দিচ্ছেন, কোনো দেশে মার্কিন সেনা না থাকলে এসব প্রস্তাব অর্থহীন।

ভিন্নমত ও ভবিষ্যৎ সংকেত
কিছু রিপাবলিকান এখনো ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দাবিকে সমর্থন করলেও জোরপূর্বক দখলের সম্ভাবনা নাকচ করছেন। সবচেয়ে কড়া আপত্তি এসেছে সেই সব রিপাবলিকানের কাছ থেকে, যারা শিগগিরই কংগ্রেস ছাড়ছেন।
নেব্রাস্কার প্রতিনিধি ডন বেকন বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডে আগ্রাসন হলে অভিশংসনের পথে যেতে পারেন তিনি। সিনেটর টিলিস আবার হোয়াইট হাউসের কয়েকজন উপদেষ্টাকে লক্ষ্য করে বলেছেন, কোনো মিত্র দেশের ভূখণ্ড দখলের জন্য চাপ সৃষ্টি করা চরম বোকামি।
সব মিলিয়ে গ্রিনল্যান্ড ইস্যু এখন শুধু একটি দ্বীপ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশ, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















