বিশ্বজুড়ে মেধা, পুঁজি ও উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতা যখন তুঙ্গে, তখন দুবাই শুধু করমুক্ত সুবিধার ওপর নির্ভর না করে নিয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ও লক্ষ্যভিত্তিক কৌশল। এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দশ বছর মেয়াদি দুটি আবাসন ব্যবস্থা—দুবাই ব্লু ভিসা ও দুবাই গোল্ডেন ভিসা। একদিকে পরিবেশ ও জলবায়ু নেতৃত্বকে আকর্ষণ, অন্যদিকে বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও উচ্চদক্ষ পেশাজীবীদের ধরে রাখাই এর মূল লক্ষ্য।
এই দুটি ভিসা কেবল যাতায়াতের অনুমতিপত্র নয়; বরং নবায়নযোগ্য দশ বছরের প্রতিশ্রুতি, যার মাধ্যমে দুবাই তার ভবিষ্যৎ জনসম্পদ গড়ে তুলতে চায়। এখানে লক্ষ্য ক্ষণস্থায়ী সম্পদ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী মানবপুঁজি।
দুটি ভিসার ভিন্ন দর্শন
গোল্ডেন ভিসা চালু হয় আগে এবং এর পরিধি বিস্তৃত। এটি দুবাইয়ের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য পরিকল্পনার মূল চালিকা শক্তি। রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ, নতুন ব্যবসা ও করপোরেট সদর দপ্তর স্থানান্তরের মাধ্যমে এর সাফল্য পরিমাপ করা হয়।
এর বিপরীতে ব্লু ভিসা তুলনামূলক নতুন ও সূক্ষ্ম একটি উদ্যোগ। এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেট জিরো ২০৫০ লক্ষ্য এবং সবুজ অর্থনীতিতে বৈশ্বিক নেতৃত্বের পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পরিবেশবিজ্ঞানী, সবুজ উদ্যোক্তা ও জলবায়ু কর্মীদের দশ বছরের স্থিতিশীলতা দিয়ে দুবাই নিজস্ব টেকসই প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নিতে চায়।
যোগ্যতার মূল বিভাজন
ব্লু ভিসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নে প্রমাণিত অবদান। এখানে ন্যূনতম বেতন বা বিনিয়োগের শর্ত নেই; মূল্যায়নের মানদণ্ড হলো কাজের বাস্তব প্রভাব। পরিবেশবান্ধব স্টার্টআপের প্রতিষ্ঠাতা, পরিবেশবিজ্ঞানে গবেষক, আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থার কর্মকর্তা, টেকসই উন্নয়ন পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং বড় প্রতিষ্ঠানে কার্বন নিঃসরণ কমাতে নেতৃত্ব দেওয়া নির্বাহীরা এই ভিসার আওতায় আসেন।
গোল্ডেন ভিসা তুলনামূলকভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত। নির্দিষ্ট মূল্যের সম্পত্তিতে বিনিয়োগকারী, সরকারি অনুমোদিত উদ্যোক্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও উচ্চ বেতনের পেশাজীবী, শিল্পী ও ক্রীড়াবিদ, এমনকি কৃতিত্বপূর্ণ শিক্ষার্থীরাও এই ভিসার যোগ্য।

সুবিধার পার্থক্য
ব্লু ভিসার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রবেশাধিকার। ভিসাধারীরা টেকসই উন্নয়নভিত্তিক নেটওয়ার্ক, অনুদান কর্মসূচি, বিশেষায়িত ইনকিউবেটর এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অগ্রাধিকার পান। এটি মূলত একটি পেশাগত ইকোসিস্টেমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ।
গোল্ডেন ভিসা ব্যবসা ও জীবনযাপনের মৌলিক স্থিতিশীলতা দেয়। স্থানীয় স্পনসর ছাড়াই শতভাগ ব্যবসার মালিকানা, সহজ যাতায়াত এবং রিয়েল এস্টেট বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি এর প্রধান দিক।
ব্লু ভিসার নির্দিষ্ট ক্ষেত্র
এই ভিসা মূলত লক্ষ্যভিত্তিক। চক্রাকার অর্থনীতি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও টেকসই কৃষি প্রযুক্তিতে কাজ করা উদ্যোক্তা, জল সংরক্ষণ বা কার্বন ধরার প্রকল্পে যুক্ত গবেষক, সৌর ও বায়ু শক্তি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশনীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখা নেতা এবং করপোরেট পর্যায়ে পরিবেশগত পরিবর্তন ঘটানো নির্বাহীরা এখানে অগ্রাধিকার পান।

আবেদন প্রক্রিয়ার বাস্তবতা
ব্লু ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া কঠোর। আবেদনকারীকে প্রকল্প প্রতিবেদন, পুরস্কারের প্রমাণ, সংস্থার সুপারিশ ও বাস্তব পরিবেশগত প্রভাবের দলিল জমা দিতে হয়। এখানে ব্যাংক ব্যালান্স নয়, যাচাই করা হয় অবদানের সত্যতা।
গোল্ডেন ভিসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় পথ হলো সম্পত্তি বিনিয়োগ। ন্যূনতম নির্ধারিত মূল্যের এক বা একাধিক সম্পত্তি থাকলে আবেদন তুলনামূলক সহজ হয়। প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বায়োমেট্রিক যাচাই শেষে সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভিসা পাওয়া যায়।
বিনিয়োগ ও সময়সূচি
সরকারি ফি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বিমা খরচ দুই ভিসাতেই প্রায় সমান। তবে গোল্ডেন ভিসার সম্পত্তি বিনিয়োগে বড় অঙ্কের প্রাথমিক ব্যয় রয়েছে। সময়ের দিক থেকে স্পষ্ট নথিপত্র থাকলে গোল্ডেন ভিসা দ্রুত পাওয়া যায়, আর ব্লু ভিসায় পেশাগত মূল্যায়নের কারণে সময় কিছুটা বেশি লাগতে পারে।
কোন ভিসা কার জন্য
যাঁদের জীবনকর্ম পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং যাঁরা আমিরাতের সবুজ রূপান্তরের অংশ হতে চান, তাঁদের জন্য ব্লু ভিসা একটি মর্যাদাপূর্ণ ও বিশেষায়িত পথ।
অন্যদিকে বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা মনোভাব বা উচ্চ বেতনের পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে যাঁরা ভবিষ্যৎ গড়তে চান, তাঁদের জন্য গোল্ডেন ভিসা বেশি বাস্তবসম্মত ও সহজলভ্য বিকল্প।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















