সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা কমানো, সড়ক উন্নয়ন এবং নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আবারও বিলম্বিত হয়েছে। একাধিক দফা সময়সীমা বাড়ানোর ফলে প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়ে গেছে।
সিলেট নগরীতে জলাবদ্ধতা এখনো একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। সমস্যা সমাধানে বারবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নগরবাসীকে দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ থেকে পুরোপুরি মুক্ত করা যায়নি। এই খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত সুফল এখনো স্পষ্ট নয়।
সিলেট সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই হাজার বাইশ সালের ভয়াবহ বন্যার পর নগরবাসীকে রক্ষায় একাধিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে বাস্তবায়নের গতি ও পরিধি সীমিত থাকায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ‘সিলেট সিটি করপোরেশনের জলাবদ্ধতা নিরসন, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পটির ব্যয় বেড়েছে মূলত দীর্ঘসূত্রতা এবং কাজের পরিধি বৃদ্ধির কারণে।
প্রকল্পটি প্রথমে এক হাজার দুইশ আটাশ কোটি দুই লাখ টাকায় অনুমোদিত হয়েছিল। বর্তমানে সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার সাতশ ছেষট্টি কোটি পাঁচ লাখ টাকায়, যা প্রায় পাঁচশ আটত্রিশ কোটি টাকা বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রকল্পটির পৃষ্ঠপোষক সংস্থা এবং সিলেট সিটি করপোরেশন এটি বাস্তবায়ন করছে। পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, সংশোধিত ব্যয়ের মধ্যে এক হাজার পাঁচশ বিশ কোটি ছাপ্পান্ন লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং বাকি দুইশ পঁয়তাল্লিশ কোটি ঊনপঞ্চাশ লাখ টাকা সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল শুরুতে দুই হাজার কুড়ি সালের জানুয়ারি থেকে দুই হাজার তেইশ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। প্রথম সংশোধনের মাধ্যমে সময়সীমা বাড়িয়ে দুই হাজার চব্বিশ সালের ডিসেম্বর করা হয়। পরে ব্যয় না বাড়িয়ে তা আবার বাড়িয়ে দুই হাজার পঁচিশ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।
দ্বিতীয় সংশোধনের আওতায় প্রকল্পটির সমাপ্তির সময়সীমা আরও বাড়িয়ে দুই হাজার ছাব্বিশ সালের জুন করা হয়েছে। অতিরিক্ত ও অধিক টেকসই কাজের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে এই সময় বাড়ানো হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, সিলেট অঞ্চলের ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে নিয়মিত জলাবদ্ধতা ও সড়ক ক্ষতির ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের কাজের ধরনে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এখন সাধারণ পৃষ্ঠতলের পরিবর্তে আরসিসি সড়ক, ড্রেন ও রিটেইনিং ওয়ালের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পের প্রধান কাজের মধ্যে রয়েছে দুইশ ঊনসত্তর দশমিক এক আট কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ এবং তিনশ তেষট্টি দশমিক নয় দুই কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ। পাশাপাশি ছয় দশমিক সাত তিন কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া বাইশ দশমিক সাত পাঁচ কিলোমিটার সড়ক বিভাজক নির্মাণের সঙ্গে গাছ লাগানো, সিসি ব্লক ও আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল ব্যবহার করে ঢাল সুরক্ষা কাজ এবং বারো দশমিক সাত এক কিলোমিটার সীমানা প্রাচীর নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জননিরাপত্তা বাড়াতে একটি পাবলিক টয়লেট এবং বড় ড্রেনের পাশে এক দশমিক তিন সাত কিলোমিটার স্টিল রেলিং নির্মাণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নগর সেবা উন্নয়নের অংশ হিসেবে দুইশ ছত্রিশ দশমিক শূন্য পাঁচ কিলোমিটার পানির পাইপলাইন স্থাপন এবং দুইশ তেষট্টি দশমিক পাঁচ শূন্য কিলোমিটার বৈদ্যুতিক কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সম্প্রসারিত নগর এলাকায় নিরাপদ রাতের চলাচল নিশ্চিত করতে বাড়তি সড়কবাতি স্থাপনও রয়েছে।
এছাড়া নগরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তেরটি প্রধান খাল ও ছড়ার নিয়মিত খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চুয়াত্তরটি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও যানবাহন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশোধিত প্রস্তাবে ইতোমধ্যে ফাটল ও গর্ত দেখা দেওয়া সড়কে নতুন করে কার্পেটিং এবং সড়ক প্রশস্তকরণের সময় বাড়ির মালিকদের সম্মতিতে ভেঙে ফেলা সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণের ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দুই হাজার পঁচিশ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে দুই হাজার একশ ছিয়াশি কোটি একান্ন লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে বিরানব্বই দশমিক শূন্য নয় শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি বিরানব্বই দশমিক পাঁচ শূন্য শতাংশ।
পরিকল্পনা কমিশন তাদের সুপারিশে জানিয়েছে, প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় সড়ক, ড্রেনেজ, ফুটপাত ও নিরাপদ পানির সরবরাহ ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। এর ফলে দেশের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চলের একটি হিসেবে পরিচিত সিলেটে নগর স্থিতিস্থাপকতা বহুলাংশে বাড়বে।
ইউএনবি 



















