সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রচিন্তা ও নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রে রয়েছে এক গভীর মূল্যবোধ—সংকল্প। এই সংকল্প কেবল আবেগ বা বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনা, কৌশল নির্ধারণ, সক্ষমতা গঠন ও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তবে প্রতিফলিত। বৈধ রাষ্ট্রকে রক্ষা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে এই সংকল্পই আমিরাতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য অন্যতম গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের কার্যক্রম কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
লাল সাগরে হুমকি ও বৈশ্বিক প্রভাব
হুতিদের সবচেয়ে বিপজ্জনক কার্যক্রমের একটি হলো আন্তর্জাতিক নৌপথে পরিকল্পিত হামলা। লাল সাগর ও আশপাশের জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণের মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে কার্যত সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পরিণত করেছে। এর ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই নয়, বিশ্বব্যাপী সরবরাহব্যবস্থা ও জ্বালানি নিরাপত্তা চাপে পড়েছে। এই বাস্তবতা হুতি হুমকিকে স্থানীয় নয়, বরং বৈশ্বিক সংকট হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে।
ইয়েমেনকে সন্ত্রাসের ঘাঁটিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা
নৌপথের নিরাপত্তার বাইরেও হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ইয়েমেনকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্রে পরিণত করার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। বিভিন্ন প্রমাণে উঠে এসেছে, হুতি আন্দোলনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের যোগাযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের দুর্গম এলাকায় চরমপন্থী গোষ্ঠীর উপস্থিতি ও বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই মিলিত তৎপরতা সন্ত্রাস, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও উগ্র মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে, যার প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
আমিরাতের নীতিগত ও কৌশলগত অবস্থান
এই পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছে। আমিরাতের দৃষ্টিতে, বৈধ জাতীয় রাষ্ট্রকে শক্তিশালী না করলে এবং সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে না দাঁড়ালে আঞ্চলিক নিরাপত্তা টেকসই হতে পারে না। এই বিশ্বাস থেকেই আরব জোটে আমিরাতের অংশগ্রহণ শুরু হয়, যার লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনের বৈধ সরকারকে সমর্থন এবং সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে সাধারণ ইয়েমেনিদের পাশে দাঁড়ানো।

মাঠপর্যায়ে সামরিক ভূমিকা ও অর্জন
কৌশলগত ও সামরিক পর্যায়ে আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এডেন শহর মুক্ত করার মাধ্যমে দক্ষিণ ইয়েমেনের পতন ঠেকানো সম্ভব হয়। পরবর্তীতে আবিয়ান, লাহিজ ও শাবওয়া প্রদেশে সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে হুতিদের অগ্রযাত্রা রোধ করা হয়। একই সঙ্গে পশ্চিম উপকূল ও বাব আল মানদাব প্রণালী নিরাপদ করার উদ্যোগ আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখে।
সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান
আমিরাতের ভূমিকা শুধু হুতিদের বিরুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আল কায়েদার দখল থেকে মুকাল্লা শহর মুক্ত করার মাধ্যমে সন্ত্রাসী সংগঠনটির আর্থিক ও কার্যকরী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপগুলো কেবল সামরিক সাফল্য নয়, বরং আগাম নিরাপত্তা কৌশলের প্রতিফলন, যার লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ না দেওয়া।
মানবিক সহায়তা ও উন্নয়নের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি
নিরাপত্তা উদ্যোগের পাশাপাশি আমিরাত ইয়েমেনে ব্যাপক মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে। এক দশকে প্রায় ত্রিশ বিলিয়ন দিরহামের সহায়তা ইয়েমেনের সব প্রদেশে পৌঁছেছে, যা কোটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। এই সহায়তা প্রমাণ করে, আমিরাত নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে আলাদা করে দেখে না, বরং দুটিকে পরস্পর নির্ভরশীল হিসেবে বিবেচনা করে।
আমিরাতে হামলা ও জাতীয় সংহতি
দুই হাজার বাইশ সালের জানুয়ারিতে আমিরাতের বেসামরিক স্থাপনায় হুতিদের হামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে আমিরাতের নেতৃত্ব ও কূটনীতির প্রতি কতটা আস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সশস্ত্র বাহিনী, জরুরি সেবা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি ও পেশাদারত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
এই সংকটময় সময়ে আমিরাতের সমাজে যে ঐক্য ও সংহতি দেখা গেছে, তা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শক্তিরই প্রতিচ্ছবি। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আগাম নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মূল্যায়ন ও উপসংহার
হুতি হুমকির মোকাবিলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশল দেখিয়েছে, কীভাবে গভীরভাবে প্রোথিত মূল্যবোধ কার্যকর রাষ্ট্রচিন্তায় রূপ নিতে পারে। সামরিক দৃঢ়তা, মানবিক অঙ্গীকার, কূটনৈতিক তৎপরতা ও সামাজিক সহনশীলতার সমন্বয়ে আমিরাত একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা মডেল উপস্থাপন করেছে। এই মডেল একদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর, অন্যদিকে বৈধতা ও নৈতিকতার প্রশ্নে অবিচল, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















