অ্যান্টার্কটিকার তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। আর সেই উষ্ণতার সরাসরি চাপ পড়ছে পেঙ্গুইনদের জীবনে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অ্যান্টার্কটিকার তিন প্রজাতির পেঙ্গুইন স্বাভাবিক সময়ের প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই প্রজনন শুরু করছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিবর্তন সবচেয়ে বড় বিপদ ডেকে আনছে অ্যাডেলি ও চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের জন্য, যাদের শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিলুপ্তির ঝুঁকি রয়েছে।
অ্যান্টার্কটিকার প্রজনন এলাকায় গত এক দশকে তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই উষ্ণতা পেঙ্গুইনদের জীবনচক্রে অস্বাভাবিক দ্রুত পরিবর্তন এনেছে। গবেষকদের মতে, মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে এত অল্প সময়ে প্রজনন সময় বদলের নজির আর নেই। প্রজননের সময় খাবারের প্রাচুর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য না হলে ছানাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে, আর এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় সংকট।
জীবনচক্রে রেকর্ডগতির পরিবর্তন
গবেষণায় দেখা যায়, অ্যাডেলি, চিনস্ট্র্যাপ ও জেন্টু পেঙ্গুইন এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুত প্রজনন শুরু করছে। ইউরোপের এক পাখির ক্ষেত্রে একই রকম পরিবর্তন হতে লেগেছিল প্রায় পঁচাত্তর বছর, অথচ পেঙ্গুইনের ক্ষেত্রে তা ঘটেছে মাত্র দশ বছরে। এই দ্রুততার কারণেই বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন।
গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা এক দশকের বেশি সময় ধরে অ্যান্টার্কটিকার বিভিন্ন উপনিবেশে ক্যামেরা বসিয়ে পেঙ্গুইনদের প্রজনন পর্যবেক্ষণ করেছেন। হাজার হাজার ছবি বিশ্লেষণ করে তারা নিশ্চিত হন, সময়ের এই পরিবর্তন স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।
উষ্ণতায় কারা জিতছে, কারা হারছে
উষ্ণ অ্যান্টার্কটিকায় সব পেঙ্গুইনের ভাগ্য এক রকম নয়। জেন্টু পেঙ্গুইন তুলনামূলকভাবে বৈচিত্র্যময় খাবার খায় এবং তারা কম দূরত্বে যাতায়াত করে। অন্যদিকে অ্যাডেলি ও চিনস্ট্র্যাপ প্রধানত ক্রিলের ওপর নির্ভরশীল। আগে এই তিন প্রজাতির প্রজননের সময় আলাদা ছিল, ফলে খাবারের প্রতিযোগিতা তেমন ছিল না। এখন জেন্টু পেঙ্গুইনের প্রজনন আরও আগেই শুরু হওয়ায় একই সময়ে খাবারের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।

গবেষকদের মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যেসব জায়গায় আগে অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের বাসা ছিল, সেখানে এখন জেন্টু পেঙ্গুইনের আধিপত্য বেড়েছে। তথ্য ও বাস্তব চিত্র দুটোই একই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিলুপ্তির আশঙ্কা বাড়ছে
বিশ্বজুড়ে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। গবেষণা মডেল বলছে, এই হারে চললে শতাব্দীর শেষের আগেই তারা বিলুপ্ত হতে পারে। অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের অবস্থাও ভালো নয়, বিশেষ করে অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই অঞ্চল থেকে তারা পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।
খাবারের চক্রে আগাম ধাক্কা
পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর দ্রুত উষ্ণ হওয়া অঞ্চলগুলোর একটি। উষ্ণতার ফলে সমুদ্রের বরফ দ্রুত গলছে। বরফ কমে গেলে বসন্তের শুরুতেই ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের বিস্ফোরণ ঘটে, যা পুরো খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি। এই প্রক্রিয়া আগেভাগে শুরু হওয়ায় পেঙ্গুইনের প্রজননের সময়ের সঙ্গে খাবারের সর্বোচ্চ প্রাপ্যতা আর মিলছে না।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আগেভাগে শুরু হওয়া বাণিজ্যিক মাছ ধরা। ফলে ক্রিলের প্রাপ্যতা আরও কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে অ্যাডেলি ও চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের ছানাদের জন্য পরিস্থিতি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
মানুষের ভালোবাসায় গবেষণার অগ্রগতি
এই গবেষণায় সাধারণ মানুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার ক্যামেরায় তোলা লাখ লাখ ছবি বিশ্লেষণে সহায়তা করেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। পেঙ্গুইনের প্রতি মানুষের ভালোবাসাই এই বিশাল তথ্য ভান্ডার গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে বলে গবেষকরা জানান।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রজননের সময় বদল জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট সংকেত। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা, যাতে ভবিষ্যতে পেঙ্গুইন সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















