পাকিস্তানে সোনার বাজারে নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছে। প্রথমবারের মতো দেশটিতে প্রতি তোলা সোনার দাম পাঁচ লাখ রুপি অতিক্রম করেছে। বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশীয় বাজারে।
দাম বৃদ্ধির রেকর্ড
বাজার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার একদিনেই প্রতি তোলা সোনার দাম বেড়েছে ১২ হাজার ৭০০ রুপি। এতে নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬ হাজার ৩৬২ রুপি। একই সময়ে ১০ গ্রাম সোনার দাম বেড়ে হয়েছে ৪ লাখ ৪৪ হাজার ১২৩ রুপি, যা আগের তুলনায় ১০ হাজার ৮৮৮ রুপি বেশি।
আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব
দেশীয় বাজারের এই ঊর্ধ্বগতি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বৈশ্বিক লেনদেনে সোনার দাম নতুন রেকর্ড গড়ে প্রতি আউন্সে পৌঁছেছে ৪ হাজার ৮৮৮ দশমিক ৪১ ডলারে। একই সঙ্গে রুপার দামও বেড়ে প্রতি আউন্স ৯৫ দশমিক ৮৯ ডলারে উঠেছে, যা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে মূল্যবান ধাতুর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে স্পষ্ট করে।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিনিয়োগকারীদের আশ্রয়
ইন্টারঅ্যাকটিভ কমোডিটিজের পরিচালক আদনান আগর জানান, গত দুই দিনে সোনা ও রুপার দামে তীব্র উত্থান দেখা গেছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক সোনা ক্রয়।
তার মতে, সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের পর সোমবার থেকেই সোনার দাম বাড়তে শুরু করে। ওই বক্তব্যে তিনি গ্রিনল্যান্ড ও ইউরোপের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দেন এবং গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেন। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে।
অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে দাম আরও বাড়তে পারে
আদনান আগরের মতে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুর সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এবং সোনার দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্পষ্টতা না আসা পর্যন্ত মূল্যবান ধাতুর দাম উচ্চ অবস্থানে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা
স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি সোনার দীর্ঘমেয়াদি ঊর্ধ্বগতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী ক্রয়নীতি। গত প্রায় দুই বছর ধরে এই প্রবণতা চললেও ২০২৫ সালে রেকর্ড উচ্চমূল্যের মধ্যেও কেনাকাটা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগের মতো দামের চূড়ায় পৌঁছে কেনাকাটা থেমে যাওয়ার নজির এবার দেখা যায়নি।
ডলারের ওপর আস্থার প্রশ্ন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফেরার পর বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে বলে মনে করেন আদনান আগর। যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো, কানাডা, ইউরোপ ও ভেনেজুয়েলার মতো মিত্রদের সঙ্গে কঠোর অবস্থান এবং ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে ভূখণ্ড ছাড় দিয়ে শান্তি চুক্তিতে চাপ দেওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিক আস্থাকে দুর্বল করেছে।
তার ভাষায়, এসব পরিস্থিতি বিশ্বকে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য অংশীদার নয়। এতে ডলারের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে অবস্থানও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সোনার দিকে ঝুঁকছে বিশ্ব
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রিজার্ভের ক্ষেত্রে ডলারের বিকল্প হিসেবে সোনাই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মাধ্যম হিসেবে সামনে আসছে। ফলে অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রামানের অবমূল্যায়নের ঝুঁকি কমাতে ডলারের বদলে সোনার মজুত বাড়াচ্ছে।
শেয়ারবাজারে অস্থিরতা
বৈশ্বিক বাজারে এই সপ্তাহে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ঘিরে শুল্ক হুমকির পর ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলো মঙ্গলবার বড় পতনের মুখে পড়ে। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনা ও রুপার দিকে আরও বেশি ঝুঁকছেন।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের দিকে নজর
বাজার বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এখন ডাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের দিকে। এই সফরে দেওয়া বক্তব্য ও ইঙ্গিতগুলো বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















