নিজস্ব যাত্রীবাহী বিমান শিল্পকে শক্তিশালী করতে নতুন পাঁচ বছরের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে চীন। এই পরিকল্পনায় সি৯১৯ বিমানের উৎপাদন বাড়ানো, দেশীয় ইঞ্জিন উন্নয়ন এবং বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চীনের নিজস্ব বিমান বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
চীন আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে নিজেদের তৈরি যাত্রীবাহী বিমানের বহর দ্রুত বাড়াতে চায়। এর মধ্যে রয়েছে সি৯০৯ আঞ্চলিক বিমান, সি৯১৯ সংকীর্ণ দেহের যাত্রীবাহী বিমান এবং সি৯২৯ প্রশস্ত দেহের দীর্ঘপাল্লার বিমান।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য বিশ্বের বিমান নির্মাণ শিল্পে আধিপত্য বিস্তারকারী দুটি প্রতিষ্ঠান বোয়িং ও এয়ারবাসের একচেটিয়া অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করা। জাতীয় পাঁচ বছরের পরিকল্পনার মাধ্যমে বিমান উৎপাদন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দেশীয় ইঞ্জিন ব্যবহারের বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী পাঁচ বছর এই তিন ধরনের বিমানের সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ইঞ্জিনসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোও হবে এই পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য। চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন মোকাবিলায় এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
উৎপাদন বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ
নতুন পরিকল্পনায় বিমান উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহ শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ ধরনের বিমানের সংস্করণও তৈরি করা হবে। এর মধ্যে উচ্চভূমি অঞ্চলে পরিচালনার উপযোগী একটি বিশেষ সংস্করণ তৈরি করা হবে, যা উচ্চতায় অবস্থিত বিমানবন্দরে সহজে উড়তে পারবে।
উচ্চতায় বাতাস পাতলা হওয়ার কারণে ইঞ্জিনের ক্ষমতা ও বিমানের উত্তোলন শক্তি কমে যায়। তাই এমন পরিবেশে কার্যকরভাবে চলতে পারে এমন প্রযুক্তি উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রশস্ত দেহের বিমানের উন্নয়নে যে প্রযুক্তিগত বাধা রয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতেও পরিকল্পনায় জোর দেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনা ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকনির্দেশনা দেবে। পরিকল্পনায় দেশীয় উচ্চ-বাইপাস টার্বোফ্যান ইঞ্জিন সিজে–১০০০ দ্রুত সার্টিফিকেশন ও ব্যবহারের লক্ষ্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সি৯১৯ বিমানের উৎপাদন বাড়ানোর গুরুত্ব
অভিজ্ঞ বিমান শিল্প পরামর্শক ব্রায়ান ইয়াং বো বলেন, সি৯১৯ প্রকল্পে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল করা।

তার মতে, এটি প্রকল্পটির সামনে থাকা বাস্তব সমস্যাগুলোর একটি সরাসরি স্বীকৃতি। তাই এখন প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে উৎপাদন স্থিতিশীল করা এবং ধীরে ধীরে তা বাড়ানো।
সি৯১৯ হলো চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কমাকের প্রধান যাত্রীবাহী বিমান। এটি ২০২৩ সালের মে মাস থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে বাণিজ্যিকভাবে উড়ছে।
সরবরাহ সংকট ও উৎপাদন বাধা
তবে ২০২৫ সালে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক জটিলতার কারণে সি৯১৯ উৎপাদন ব্যাহত হয়। বিশেষ করে লিপ–১সি ইঞ্জিনের সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
এই ইঞ্জিনটি তৈরি করে সিএফএম ইন্টারন্যাশনাল, যা যুক্তরাষ্ট্রের জিই অ্যারোস্পেস ও ফ্রান্সের সাফরানের যৌথ উদ্যোগ।
এর ফলে গত বছর কমাক মাত্র ১৫টি সি৯১৯ বিমান সরবরাহ করতে পেরেছে, যা তাদের বার্ষিক ৭৫টি উৎপাদনের মূল লক্ষ্য থেকে অনেক কম।
দেশীয় সিজে–১০০০ ইঞ্জিনের গুরুত্ব
বিশ্লেষক ইয়াং বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীল রাখার কারণেই সিজে–১০০০ ইঞ্জিনকে পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার মতে, এই ইঞ্জিনটি লিপ ইঞ্জিনের বিকল্প নয়, বরং উৎপাদন ব্যাহত হলে সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হচ্ছে।

চীনের অ্যারো ইঞ্জিন করপোরেশন ইতোমধ্যে সিজে–১০০০ ইঞ্জিনের নকশা চূড়ান্ত করেছে এবং এখন এর উড্ডয়নযোগ্যতা অনুমোদনের জন্য কাজ চলছে। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এই ইঞ্জিন ব্যবহার করে কমাকের একটি বিমান প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে উড়তে পারে বলে তিনি ধারণা দেন।
সি৯২৯ প্রশস্ত দেহের বিমানের অগ্রগতি
সি৯২৯ হলো চীনের উন্নয়নাধীন প্রশস্ত দেহের দীর্ঘপাল্লার বিমান। এটি প্রায়ই বোয়িং ৭৮৭ এবং এয়ারবাস এ৩৫০-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়।
ইয়াং বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই বিমানের প্রথম উড্ডয়নের জন্য প্রোটোটাইপ তৈরির বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। তবে তিনি মনে করেন, এই প্রকল্পে সরকারের শক্তিশালী সমর্থন থাকবে।
সম্প্রতি জানা গেছে, কমাক এবং চীনের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ একসঙ্গে কাজ করে এই বিমানের নকশা ও সার্টিফিকেশন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক উইন্ড টানেল পরীক্ষাও শুরু হয়েছে, যা প্রকল্পটির অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।

বিদেশি বাজারে প্রবেশে সতর্ক অবস্থান
পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় সি৯১৯ বিমানের ইউরোপে অনুমোদন পাওয়া বা প্রথম বিদেশি অর্ডারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
বিশ্লেষক ইয়াং বলেন, এটি মূলত সতর্ক ও বাস্তবসম্মত অবস্থানের প্রতিফলন। কারণ বিদেশে অনুমোদন পাওয়া বা অর্ডার পাওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে নয়।
তবে তিনি বলেন, এর অর্থ এই নয় যে কমাক আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের লক্ষ্য থেকে সরে আসছে। বরং উপযুক্ত সময়ে সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















