ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের মধ্যে ইরানের বহু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এসব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার ক্ষতি ইরানিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, দুঃখ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইসফাহানে ঐতিহাসিক স্থাপনায় গুরুতর ক্ষতি
ইরানের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসফাহান শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাফাভি সাম্রাজ্যের ১৭শ শতকের নিদর্শন আলি কাপু প্রাসাদ এবং চেহেল সুতুন প্রাসাদ ও বাগান এতে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হামলার বিস্ফোরণের ঢেউয়ে বিখ্যাত জামে মসজিদের নীল টাইলস ভেঙে পড়ে। পারস্য ক্যালিগ্রাফিতে সজ্জিত গম্বুজ ও মিনারের জন্য পরিচিত এই মসজিদ পারস্য ও ইসলামী স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
তেহরানের গোলেস্তান প্রাসাদেও ধ্বংস
![]()
ইসফাহানের হামলার এক সপ্তাহ আগে রাজধানী তেহরানে আরেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা গোলেস্তান প্রাসাদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শহরের একটি পুলিশ স্টেশনে হামলার সময় বিস্ফোরণের আঘাতে ১৪শ শতকের এই প্রাসাদের বিখ্যাত আয়নার হল ভেঙে যায় এবং প্রাসাদের সুপরিকল্পিত বাগান ধ্বংসাবশেষে ভরে যায়।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ইসফাহানে হামলার লক্ষ্য ছিল গভর্নরের দপ্তর, যা নকশে জাহান স্কয়ারের কাছে অবস্থিত। ঐ এলাকাতেই বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা কাছাকাছি অবস্থান করায় সেগুলোও ক্ষতির মুখে পড়ে।
ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন ইরানিরা
মিসাইলের আঘাতে ঐতিহাসিক স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর অনেক ইরানি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তারা প্রশ্ন তুলেছেন—সরকার ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের দাবি করা হলেও কেন সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য ধ্বংস হচ্ছে।
গবেষক মোজতবা নাজাফি লিখেছেন, প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ মানুষের জীবনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো মানুষের অতীতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। এসব ধ্বংস হওয়া মানে আমাদের স্মৃতিও ধ্বংস হয়ে যাওয়া।
ইউনেস্কোর উদ্বেগ
জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো জানিয়েছে, তারা ইরানের কয়েকটি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনায় ক্ষতির প্রমাণ পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গোলেস্তান প্রাসাদ, পারস্য গার্ডেনের অংশ চেহেল সুতুন প্যাভিলিয়ন, ইসফাহানের জামে মসজিদ এবং খোররমাবাদ উপত্যকার প্রাগৈতিহাসিক স্থাপনার আশপাশের কিছু ভবন।

ইউনেস্কোর মুখপাত্র মনিয়া আদজিওয়ানু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইরান ও আশপাশের দেশে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনায় ধ্বংসের খবর নিয়ে সংস্থাটি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
ইউনেস্কো স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক আইনে সাংস্কৃতিক সম্পদ সুরক্ষিত। তারা সংঘাতের সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত স্থাপনাগুলোর অবস্থান সম্পর্কিত তথ্যও শেয়ার করেছে, যাতে সেগুলো রক্ষা করা সম্ভব হয়।
ইতিহাসবিদ নাগমেহ সোহরাবি বলেন, এসব স্থাপনা কেবল কোনো মতাদর্শের প্রতীক নয়, বরং মানব ইতিহাস ও সৌন্দর্যের জীবন্ত সাক্ষ্য, যা শুধু ইরানের নয়, পুরো বিশ্বের সম্পদ।
প্রাচীন দুর্গেও হামলার ক্ষতি
রবিবার আরেকটি হামলায় লোরেস্তান প্রদেশের খোররমাবাদে অবস্থিত প্রাচীন পাহাড়চূড়ার দুর্গ শাপুর খাস্ত বা ফালাক-অল-আফলাক দুর্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাসানীয় যুগের এই দুর্গের ইতিহাস তৃতীয় থেকে সপ্তম শতক পর্যন্ত বিস্তৃত।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই হামলায় লোরেস্তানের সংস্কৃতি বিভাগের স্থানীয় দপ্তর ধ্বংস হয়ে যায় এবং বিস্ফোরণের আঘাতে দুর্গ ও দুটি জাদুঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা স্থাপনাগুলো
ইসফাহানের জামে মসজিদ, নকশে জাহান স্কয়ারের প্রাসাদ দুটি এবং তেহরানের গোলেস্তান প্রাসাদ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত। আর ফালাক-অল-আফলাক দুর্গ ইরানের জাতীয় ঐতিহ্য তালিকায় রয়েছে।

ইরানের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মন্ত্রণালয় জানায়, আন্তর্জাতিক যুদ্ধকালীন নিয়ম মেনে সব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনায় নীল পতাকা স্থাপন করা হয়েছিল, যাতে বিমান হামলায় এগুলোকে রক্ষা করা যায়। তবে সেই সতর্কতার পরও হামলা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা সরাসরি এসব সাংস্কৃতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি। তবে কাছাকাছি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ফলে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো—এ বিষয়ে তারা কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
নকশে জাহান স্কয়ারে বিস্ফোরণের প্রভাব
ইসফাহানের নকশে জাহান স্কয়ারে বিস্ফোরণের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। ১৫৯৮ সালে সাফাভি যুগে নির্মিত প্রায় ৯ লাখ ৬৪ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই বিশাল চত্বর তার সবুজ বাগান, ঐতিহাসিক বাজার এবং নীল গম্বুজ ও মিনারে সজ্জিত প্রাসাদগুলোর জন্য বিখ্যাত।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ভিডিওতে দেখা যায়, আলি কাপু ও চেহেল সুতুন প্রাসাদের দেয়ালের চিত্রকর্ম ভেঙে পড়েছে, ফুলের নকশার টাইলস চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে এবং খোদাই করা কাঠের প্যানেল দেয়াল ও ছাদ থেকে খুলে গেছে। ছাদের অলঙ্কৃত তারকার মতো ছোট আয়নাগুলোও ভেঙে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে।
চেহেল সুতুন প্রাসাদের বাগানে একটি অগভীর জলাধারে প্রাসাদের ২০টি স্তম্ভের প্রতিফলন পড়ে, যা দেখে ৪০টি স্তম্ভের বিভ্রম তৈরি হয়। এই কারণেই এর নাম চেহেল সুতুন, যার অর্থ পারসিতে চল্লিশ স্তম্ভ।
শতাব্দীর ঝড় পেরিয়ে টিকে থাকা স্থাপনা

এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো শতাব্দীর নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন, বিদেশি আগ্রাসন, অভ্যুত্থান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ইসলামী বিপ্লব, ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক নানা আন্দোলনের মধ্যেও টিকে ছিল। কিন্তু বর্তমান সংঘাতের আঘাতে সেগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
মানুষের আবেগ ও উদ্বেগ
তেহরানের ৩৬ বছর বয়সী এক নারী বলেন, তারা দাবি করেছিল এই যুদ্ধ সরকারের বিরুদ্ধে, ইরান ও তার জনগণের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইসফাহান শহরের বাসিন্দা এবং নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে অবস্থিত জনপ্রিয় পারস্য রেস্তোরাঁর মালিক নাসিম আলিখানি বলেন, নকশে জাহান স্কয়ার কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি প্রতিটি ইরানির হৃদয় ও আত্মার প্রতীক। অসংখ্য আক্রমণ টিকে থাকা এই স্থাপনাও অবশেষে এই নিষ্ঠুর যুদ্ধের আঘাত থেকে রক্ষা পায়নি।
তিনি বলেন, এসব স্থাপনা শুধু ইরানিদের নয়, মানবজাতির সম্পদ। তাই এগুলোর ধ্বংস কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ইসফাহানের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

অনেকেই ইসফাহানকে ইরানের সবচেয়ে মোহনীয় শহর মনে করেন। পারসিতে একটি জনপ্রিয় প্রবাদ আছে—ইসফাহান, নেসফে জাহান—অর্থাৎ ইসফাহান পৃথিবীর অর্ধেকের সমান সৌন্দর্যের শহর।
ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭৪৯৩টি আবাসিক ভবন, ১৬১৭টি বাণিজ্যিক স্থাপনা, ৩২টি চিকিৎসা ও ওষুধ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান, ৬৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রেড ক্রিসেন্টের ১৩টি স্থাপনা রয়েছে।
এছাড়া অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—নকশে জাহান স্কয়ার, জামে মসজিদ, আলি কাপু প্রাসাদ, চেহেল সুতুন প্রাসাদ ও বাগান, গোলেস্তান প্রাসাদ এবং ফালাক-অল-আফলাক দুর্গ।
ইসফাহানের গভর্নর মেহদি জামালিনেজাদ এই হামলাকে বর্বরতা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আধুনিক অস্ত্র দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতার প্রতীকগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















