বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বর্তমানে যত ব্যাংক রয়েছে, তার প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তাঁর মতে, দেশের বাস্তবতায় ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট। ব্যাংকিং খাতে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে ব্যাংকের সংখ্যা কমানো জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।
ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত প্রতিষ্ঠান
বুধবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ব্যাংকিং খাত: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে গভর্নর বলেন, দেশে বর্তমানে ৬১টি ব্যাংক কার্যক্রম চালাচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। এই অতিরিক্ত সংখ্যাই খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংখ্যা কমিয়ে কৌশলগত একীভূতকরণের মাধ্যমে মাত্র দুটি ব্যাংকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যাংকিং খাত প্রায় ধ্বংসের মুখে
ড. মনসুর ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের কারণে পুরো খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এসব কারণে ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে এবং আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
লুট ও অর্থপাচারের ভয়াবহ চিত্র
গভর্নরের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। এর বড় একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর অভিযোগ, পারিবারিকভাবে নিয়ন্ত্রিত কিছু ব্যাংকের মাধ্যমে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে বাইরে চলে গেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত যেন আর ব্যাংকিং খাতকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে জন্য দ্রুত ও কঠোর সংস্কার প্রয়োজন।
খেলাপি ঋণ ও সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ
সব সমস্যার মধ্যেও গভর্নর আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, আগামী মার্চের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। সংকটে থাকা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ব্যাংক রেজোলিউশন ফান্ড গঠনের কাজ করছে। এই তহবিলের আকার হতে পারে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্য প্রযোজ্য হবে।
নগদহীন লেনদেন ও রাজস্ব বৃদ্ধি
ড. মনসুর নগদহীন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এতে কর ফাঁকি কমবে এবং বছরে অতিরিক্ত ১ দশমিক ৫ থেকে ২ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়া সম্ভব। তিনি শিক্ষার্থীদের অল্প বয়স থেকেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে সতর্কতা
গভর্নর সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ সংশোধন না হলে ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি থেকেই যাবে। তিনি মনে করেন, একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়া টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়।
সেমিনারে উপস্থিত বক্তব্য
সেমিনারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম এবং অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শরীফ মোশাররফ হোসেনসহ অন্যান্য বক্তারা ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কঠোর নজরদারি ও ঋণ আদায়ের ওপর জোর দেন। তাঁদের মতে, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের আর্থিক খাত আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















