ইউক্রেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতায় এ শীত যেন আরও নির্মম হয়ে উঠেছে। টানা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বিদ্যুৎ ও তাপ অবকাঠামো বিপর্যস্ত হওয়ায় কিয়েভসহ বড় শহরগুলোতে জীবনযাপন এখন টিকে থাকার লড়াই। বিদ্যুৎ না থাকলে ঘরে তাপ নেই, পানি নেই, নিত্যদিনের সাধারণ কাজগুলোও হয়ে উঠছে দুরূহ।
কিয়েভে শীতের লড়াই
কিয়েভের বহু বাসিন্দা এখন ঘরে তুষার জমিয়ে পানি জোগাড় করছেন। কেউ গ্যাসের চুলায় ইট গরম করে শরীরের উষ্ণতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, কেউ বা কোট, দস্তানা আর টুপি পরে ঘুমাচ্ছেন। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় অনেকে ঘরের ভেতরেই অস্থায়ী তাঁবু খাটিয়ে নিচ্ছেন। যুদ্ধ শুরুর প্রায় চার বছর পর এই প্রথম রাজধানীতে জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার।
একটি পরিবারের গল্প
সামরিক চ্যাপলিন আন্তোন রিবিকভ কিয়েভের নিজের ফ্ল্যাটে ধাতব পাত্রে পানি গরম করে সন্তানদের উষ্ণ রাখার চেষ্টা করছেন। দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ঘরের তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল মাত্র নয় ডিগ্রিতে। সেই ঠান্ডায় তার এক সন্তানের নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। তার ভাষায়, এই শীত যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন সময়।
হামলার তীব্রতা বাড়ছে
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা আরও ঘন ও কেন্দ্রীভূত হয়েছে। কিয়েভ, খারকিভ ও দিনিপ্রো শহর বিশেষভাবে নিশানায়। সামরিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, গত বছরে রাশিয়া বিপুল সংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ইউক্রেন বলছে, এসব হামলা প্রমাণ করে মস্কোর শান্তির কোনো আগ্রহ নেই।

বিদ্যুৎহীন নগরজীবন
মাইনাস আঠারো ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যে কিয়েভের লক্ষাধিক পরিবার দিনের পর দিন বিদ্যুৎ ও পানিহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। এক রাতের হামলার পর শহরের এক মিলিয়নের বেশি ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না বলে জানান প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। গোসল, রান্না কিংবা ফোন চার্জ করাও হয়ে উঠছে সংগ্রামের বিষয়।
মানসিক চাপ ভাঙার কৌশল
কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকোর মতে, এসব হামলার উদ্দেশ্য কেবল অবকাঠামো ধ্বংস নয়, মানুষের মনোবল ভেঙে দেওয়া। তার ভাষায়, মানুষকে হতাশ করে শহর ছাড়তে বাধ্য করাই আগ্রাসনের লক্ষ্য। তবু শহরের নানা স্কুল ও অস্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে মানুষ জড়ো হয়ে জেনারেটরের উষ্ণতায় একটু স্বস্তি খুঁজে নিচ্ছেন।

সহায়তার হাত বাড়াচ্ছে পশ্চিম
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররা জেনারেটর, শক্তিশালী ব্যাটারি ও শিল্প বয়লার পাঠাচ্ছে। তবে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, অক্টোবরের পর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে। গ্যাস উৎপাদনেও বড় ধাক্কা লেগেছে।
জরুরি সংস্কার আর সীমাবদ্ধতা
শহরজুড়ে মেরামত দলগুলো দিনরাত কাজ করছে, কিন্তু অবকাঠামোর ওপর চাপ এত বেশি যে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা কঠিন। নতুন জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিকেন্দ্রীকৃত ছোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিছু অগ্রগতি হলেও বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তা যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহেও পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি আশা করা যাচ্ছে না।

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
তীব্র শীত ও সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় অনেক পরিবার সন্তানদের নিরাপদ স্থানে পাঠানোর কথা ভাবছে। রিবিকভের মতো অনেক অভিভাবকই বলছেন, সন্তানদের উষ্ণতা নিশ্চিত করাই এখন প্রথম লক্ষ্য। যুদ্ধের এই কঠিন শীতে ইউক্রেনবাসীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ টিকে থাকা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















