মার্চ ২৮, ২০২২ সালে কৃষ্ণসাগর থেকে উদ্ধার করা একটি ভাসমান সমুদ্র মাইন। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্র সময়ে আঞ্চলিক জলসীমায় এমন মাইন ভেসে উঠতে শুরু করেছিল। — রোমানিয়ান নৌবাহিনী
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ধারণা করা হচ্ছে, তেহরান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালীকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারে। আশঙ্কা রয়েছে, জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে ইরান সেখানে সমুদ্র মাইন ব্যবহার করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের বেশি সময় পর বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইতিমধ্যে ইরানের ২৮টি মাইন পাতা জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
১৯৮০–এর দশকে যেমনটি করেছিল, তেমনি যদি ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে মাইন পেতে দেয়, তবে পশ্চিমা দেশগুলোর মাইন অপসারণকারী দলগুলোর জন্য তা বড় ধরনের দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠবে।
নিচে বিষয়টি সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
সমুদ্র মাইন কী
ফরাসি নৌবাহিনীর এক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এএফপিকে বলেন, “মাইন হলো দরিদ্র দেশের অস্ত্র।”
তবে তিনি বলেন, এই অস্ত্র সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং নৌবাহিনীর চলাচলের স্বাধীনতার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।
ইরানের কাছে কত মাইন রয়েছে
ফরাসি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের গবেষক এলি টেনেনবাউম জানান, ইরানের কাছে আনুমানিক পাঁচ থেকে ছয় হাজার নৌ-মাইন রয়েছে। এর মধ্যে এমন ভাসমান মাইনও আছে, যেগুলো আটকানো অত্যন্ত কঠিন।
কন্টাক্ট মাইন নামে পরিচিত কিছু মাইন স্রোতের সঙ্গে পানির উপর ভেসে থাকতে পারে বা সমুদ্রের তলদেশে নোঙরের সঙ্গে বাঁধা থাকে। জাহাজের গায়ে স্পর্শ করলেই এগুলো বিস্ফোরিত হয়।
সাবেক ওই নৌ কর্মকর্তা বলেন, “এটি সবচেয়ে সাধারণ, সবচেয়ে সস্তা এবং হরমুজ প্রণালীর প্রধান হুমকি।”

এছাড়া ইরানের কাছে প্রভাবভিত্তিক মাইনও রয়েছে, যা উপসাগরের অগভীর পানির জন্য উপযোগী। এসব মাইন সমুদ্রের তলায় পেতে রাখা হয় এবং উপরে বড় জাহাজ শনাক্ত হলেই বিস্ফোরিত হয়।
তিনি আরও জানান, দ্রুতগামী ছোট নৌকা ব্যবহার করে জাহাজের গায়ে লিম্পেট মাইন লাগানোও সম্ভব। নির্দিষ্ট সময় পর সেগুলো বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য সেট করা থাকে।
২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে দ্রুতগতির ছোট নৌকা ব্যবহার করে ইরান খুব দ্রুত এসব মাইন স্থাপন করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান তাদের অনেক ছোট ‘আশুরা’ নৌকায় মাইন বসানোর জন্য বিশেষ রেল ব্যবস্থা স্থাপন করেছে, যাতে অন্তত একটি মাইন বহন করা যায়।
তবে সাবেক ওই নৌ কর্মকর্তা বলেন, প্রয়োজনে অন্য ছোট নৌকাকেও গোপনে মাইন বসানোর কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।
আগে কি এসব মাইন ব্যবহার হয়েছে
১৯৮০–এর দশকে ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময় তথাকথিত ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’-এ তেহরান সমুদ্র মাইন ব্যবহার করেছিল। তখন বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে চলাচলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পাহারা দিতে হয়েছিল।
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাক প্রায় ১,৩০০টি মাইন স্থাপন করেছিল। এতে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে ইউএসএস প্রিন্সটনও ছিল। জাহাজটি আবার সচল করতে প্রায় ১০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল।
মার্কিন গবেষক স্কট ট্রুভার, যিনি নৌবাহিনী যুদ্ধ কলেজে শিক্ষকতা করেছেন, লিখেছেন যে উত্তর উপসাগরকে সম্পূর্ণ মাইনমুক্ত ঘোষণা করতে বহুজাতিক বাহিনীকে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে নিবিড় অভিযান চালাতে হয়েছিল।
মাইন অপসারণের চ্যালেঞ্জ
প্রয়োজন হলে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে হরমুজ প্রণালী থেকে মাইন অপসারণের সক্ষমতা রয়েছে। তবে এমন অভিযান দীর্ঘ এবং অত্যন্ত জটিল হবে।
গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র বাহরাইনে অবস্থানরত অ্যাভেঞ্জার শ্রেণির চারটি মাইন শিকারি জাহাজ অবসর দেয়।
এর পরিবর্তে একই সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হবে, যেগুলোতে মাইন প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে, তবে সেগুলো মূলত এ কাজের জন্য তৈরি নয়।
সমুদ্র কৌশল বিষয়ক এক গবেষণা কেন্দ্র গত বছর সতর্ক করে বলেছিল, কৌশলগতভাবে স্থাপন করা সমুদ্র মাইন মার্কিন নৌ অভিযানের অ্যাকিলিসের গোড়ালি হয়ে উঠতে পারে। ইরান ছাড়াও চীন ও রাশিয়াও এই তুলনামূলক সস্তা অস্ত্র অর্জন করেছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, প্রমাণিত বিকল্প ব্যবস্থা চালু না করেই যুক্তরাষ্ট্র তার সীমিত মাইন প্রতিরোধ সক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে।
টেনেনবাউম বলেন, এই ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলোর সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও বর্তমান হুমকির মোকাবিলায় তা এখনও পুরোপুরি পর্যাপ্ত নয়।
২০০৩ সাল থেকে উপসাগরে মোতায়েন থাকা চারটি মাইন শিকারি জাহাজের শেষটিও গত ডিসেম্বর প্রত্যাহার করে নিয়েছে ব্রিটেন।
ফ্রান্সের কাছে এখন মাত্র আটটি বিশেষায়িত মাইন অপসারণ জাহাজ রয়েছে, যা আগে ছিল ১৩টি। সাম্প্রতিক সময়ে সেগুলো উপসাগরে পাঠানোও হয়নি।
বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস এই ক্ষেত্রে দক্ষ হিসেবে পরিচিত। তবে সমুদ্র মাইন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার জন্য ড্রোন ব্যবহার করতে সক্ষম আধুনিক জাহাজ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে তারা।
উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষেত্রে মাইন অপসারণে প্রশিক্ষিত ডুবুরি রয়েছে।
তবে সাবেক ওই নৌ কর্মকর্তা বলেন, “মাইন নিষ্ক্রিয় করতে হলে আগে সেটি খুঁজে বের করতে হবে।”
Sarakhon Report 


















