ইরানে সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা অভিযানের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে তেহরান। সরকারের দাবি, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে বিদেশি ও সন্ত্রাসী শক্তি সহিংসতায় রূপ দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরান জানিয়েছে, নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় তারা কঠোর হতে বাধ্য হলেও যুদ্ধ তাদের লক্ষ্য নয়, অগ্রাধিকার শান্তি ও কূটনীতি।
শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ থেকে সহিংসতা
গত ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ইরানে অর্থনৈতিক সংস্কার ও মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ চলছিল। সরকার জানায়, এই প্রতিবাদকে তারা বৈধ হিসেবেই দেখেছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি বদলে যায়, যখন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসীরা প্রতিবাদের ভেতরে ঢুকে পড়ে। পুলিশ ও সাধারণ মানুষের ওপর চালানো হয় গুলিবর্ষণ। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা, আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া এবং নৃশংস নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সহিংসতা তিন দিনেরও কম সময় স্থায়ী ছিল। তবে সেই সময়ে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল ভয়াবহ। বাস, হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্র, স্বাস্থ্য অবকাঠামো এমনকি মসজিদ পর্যন্ত ধ্বংস করা হয়। নিহতদের বড় অংশই ছিলেন পুলিশ সদস্য ও সাধারণ নাগরিক।

যোগাযোগ বন্ধ ও পুনরুদ্ধার
সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর দাঙ্গাকারী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় সাময়িক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। সরকারের দাবি, এটি ছিল জরুরি নিরাপত্তা পদক্ষেপ। বর্তমানে ধীরে ধীরে সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিকের পথে ফিরছে।
বিদেশি প্রচারণা ও অভিযোগ
ইরান অভিযোগ করেছে, পশ্চিমা গণমাধ্যমে ঘটনার ভুল ও অতিরঞ্জিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বড় শহরগুলো নাকি সরকারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে— এমন দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে অভিহিত করা হয়েছে। তেহরানের মতে, এই ধরনের প্রচারণা ইচ্ছাকৃতভাবে সহিংসতা উসকে দিতে এবং অঞ্চল জুড়ে অস্থিরতা বাড়াতে চালানো হয়েছে।
সরকার আরও জানায়, নিরস্ত্র নিহত সবাইকে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো পুলিশ সদস্যদের পরিবারের মতোই ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা পাবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
ইরানের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এসেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বক্তব্য ও হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী গুলোকে চরম সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইরানের মতে, উদ্দেশ্য ছিল অঞ্চলকে আরেকটি বড় যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া।
ইরান সতর্ক করে বলেছে, তারা যুদ্ধ চায় না, তবে আক্রমণের শিকার হলে জবাব দিতে পিছপা হবে না। জুন ও সেপ্টেম্বরের অভিজ্ঞতা থেকে তারা দেখেছে, সংযম দেখালেও বারবার আঘাত এসেছে। তাই এবার বাস্তবতা স্পষ্ট করে তুলে ধরা হচ্ছে।
কূটনীতি বনাম সংঘাত
তেহরান জানিয়েছে, তারা সবসময় যুদ্ধের চেয়ে শান্তিকে বেছে নিয়েছে। ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ সমঝোতার জন্য তারা আলোচনায় প্রস্তুত ছিল এবং আছে। অতীতেও মধ্যপন্থী সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছানো গিয়েছিল, কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক হিসাব ও চাপের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

ইরানের বার্তা পরিষ্কার। নিষেধাজ্ঞা, সাইবার হামলা বা সামরিক চাপ দিয়ে তাদের দমিয়ে রাখা যায়নি। এখন সময় সম্মান ও বাস্তব কূটনীতির পথে হাঁটার। তাতেই অঞ্চল ও বিশ্ব আরও দূরে এগোতে পারে সংঘাতের ছায়া থেকে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















