০৪:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দ্বাদশ দিনে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান হামলার তীব্রতা হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের মাইন পাতা জাহাজে মার্কিন হামলা ইরান যুদ্ধের ধাক্কা: ইউরোপের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নতুন সংকট হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের ১৬টি মাইন পাতা নৌযানে মার্কিন হামলা যুদ্ধের কৌশল বদলে পাল্টা আঘাত দিচ্ছে ইরান, বলছে মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের খার্গ দ্বীপের নিরাপত্তায় নির্ভর করছে তেলের দাম  কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের ইসরায়েলের অস্ত্র আমদানি বৃদ্ধি ভোজ্যতেলের বাজার এখনো স্বাভাবিক হয়নি তেলের দাম কি ২০০ ডলারে উঠতে পারে

হরমুজ থেকে মস্কো—বিশ্বের জ্বালানি সংকটের মাঝেও কীভাবে তেল সরবরাহ সামলাচ্ছে ভারত

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে ওঠানামা করছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত রাশিয়ার তেল, বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত মজুত ব্যবহার করে জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।

বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থায় ভারতের আত্মবিশ্বাসী অবস্থান

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ভারত এনার্জি উইক সম্মেলনে দেশটির কর্মকর্তারা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরেন। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি ভোক্তা হিসেবে ভারত শুধু বড় বাজারই নয়, বরং অস্থির আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাস্তববাদী নীতির অনুসারী হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাত তীব্র হওয়ায় হরমুজ প্রণালীতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার দাবিকে বাস্তবে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে।

ভারতের জন্য এর তাৎক্ষণিক প্রভাব হলো পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বীমার খরচ বাড়া, সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ। তবে একই সঙ্গে এই সংকট ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের যৌক্তিকতাও স্পষ্ট করেছে—বিভিন্ন উৎস থেকে তেল আমদানি, কৌশলগত মজুত, নমনীয় কূটনীতি এবং কোনো একক জোটের ওপর নির্ভরতা কমানো।

Brent hovers around $70 per barrel - The Nation Newspaper

ব্রেন্ট তেলের দাম ও বৈশ্বিক ঝুঁকি

সংঘাত তীব্র হওয়ার আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলারের কাছাকাছি। পরে তা দ্রুত ৮০ ও ৯০ ডলার ছাড়িয়ে ৯ মার্চ সাময়িকভাবে ১১৯.৫০ ডলারে পৌঁছায়। পরে উত্তেজনা কিছুটা কমার ইঙ্গিত পাওয়ায় দাম নেমে আসে প্রায় ৯২.৪৫ ডলারে।

এই ওঠানামা দেখায় যে বর্তমান তেল বাজারের ঝুঁকি শুধু সরবরাহের ঘাটতি নয়, বরং তেল পরিবহনের পথ ও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথগুলোর নিরাপত্তা।

ঝুঁকিপূর্ণ বাজারে চাহিদার বড় কেন্দ্র ভারত

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের ২০৩০ সালের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলতি দশকে বৈশ্বিক তেল চাহিদা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় উৎস হবে ভারত। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির তেল চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ ব্যারেল বাড়তে পারে, যা বৈশ্বিক মোট চাহিদা বৃদ্ধির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।

দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। পেট্রোল, বিমান জ্বালানি এবং এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

এই বড় চাহিদা ভারতকে শক্তিশালী অবস্থান দিলেও ঝুঁকিও বাড়ায়। কারণ দেশটি তার অধিকাংশ তেলই আমদানি করে। প্রতি মাসে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার হওয়ায় তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় বা বীমা খরচ সামান্য বাড়লেও তা দ্রুত মুদ্রাস্ফীতি, সরকারি ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের বাজেটে প্রভাব ফেলতে পারে।

India to amp up energy diplomacy; Petroleum minister Puri to visit US, UAE  | Mint

ভারতের জ্বালানি মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরি সতর্ক করেছেন যে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এখন অনেকটা যুদ্ধকালীন বাস্তবতার মুখোমুখি। তেলের ঝুঁকি প্রিমিয়াম বেড়েছে, ট্যাংকার বীমা খরচ বাড়ছে, সমুদ্রপথ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে এবং ভারতের তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা এখন প্রায় ৮৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০.৯ মিলিয়ন ব্যারেল পেট্রোলিয়াম পরিবাহিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক ব্যবহারের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ।

ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং এর বড় অংশই এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।

যুদ্ধঝুঁকির কারণে জাহাজ বীমা প্রিমিয়াম সাধারণত জাহাজের মূল্যের প্রায় ০.২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ০.৫ শতাংশের বেশি হতে পারে। এতে একটি বড় তেলবাহী ট্যাংকারের একবার যাত্রায় অতিরিক্ত প্রায় দুই লাখ ডলার খরচ যোগ হতে পারে। ফলে শুধু তেলের দাম নয়, তেল পরিবহনের খরচ ও অনিশ্চয়তাও বেড়ে যায়।

তবুও এখন পর্যন্ত ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে গেলেও ভারত সরকার তাৎক্ষণিকভাবে পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা কম। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানিগুলো সাময়িকভাবে কিছু ক্ষতি বহন করে দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে।

আগের সময়ে তুলনামূলক কম দামের সুযোগে এই কোম্পানিগুলো কিছু আর্থিক সঞ্চয় গড়ে তুলেছিল, যা এখন বাজারের ধাক্কা সামলাতে কাজে লাগছে।

India will diversify energy supplies after deal with US on Russia oil  imports - The Economic Times

রুশ তেল ও সরবরাহ বৈচিত্র্যের কৌশল

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধান কৌশল হচ্ছে সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করা। ২০২২ সালের আগে ভারতের মোট তেল আমদানির মাত্র ২ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে। কিন্তু ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী হয়ে ওঠে এবং কখনো কখনো ভারতের মোট আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই রাশিয়া থেকে আসে।

ছাড়মূল্যের রুশ ‘ইউরাল’ তেল ভারতের রিফাইনারিগুলোর মুনাফা বাড়াতে এবং আমদানি ব্যয় কমাতে সহায়তা করেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ভারত ও রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলারে।

তবে এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে ভারত উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা ছেড়ে দিয়েছে। ইরাক, সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনো ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রুড ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি এবং পশ্চিম আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকেও সুযোগ অনুযায়ী তেল কেনা অব্যাহত রয়েছে।

এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে দ্রুত সরবরাহের উৎস পরিবর্তনের সক্ষমতা তৈরি করা।

সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাব

Reliance buys 6 million barrels of Russian oil for March: Report

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারতীয় রিফাইনারিগুলো মার্চ মাসের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৬ মিলিয়ন ব্যারেল রুশ তেল সংগ্রহ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশে সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় এটি সহায়ক হয়েছে।

শিল্প সূত্র বলছে, রাশিয়া প্রয়োজনে প্রায় ৯.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ভারতের দিকে পাঠাতে পারে। এর একটি অংশ এমন রুট দিয়ে আসে যা হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে যায়—যেমন সুয়েজ খাল বা আর্কটিক ও আটলান্টিক মহাসাগরীয় পথ। এতে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর না হলেও কিছুটা কমে।

যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ দিনের বিশেষ ছাড় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এই ছাড় মূলত ইতিমধ্যে লোড হয়ে সমুদ্রপথে থাকা কিছু রুশ তেলের চালানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এটি কেবল লেনদেনের অনিশ্চয়তা কমাতে একটি সাময়িক ব্যবস্থা।

বাস্তবে নিষেধাজ্ঞার সময়েও রুশ তেল ভারতের রিফাইনারিগুলোতে পৌঁছাতে থাকে, কারণ ভারতের ক্রয় সিদ্ধান্ত প্রধানত নির্ভর করে দাম, প্রাপ্যতা এবং সরবরাহের নিরাপত্তার ওপর।

কৌশলগত মজুত ও প্রস্তুতি

ভারত বর্তমানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বিত জরুরি তেল মজুত ছাড় কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে না। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান মজুত পরিস্থিতি আপাতত যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারতের কৌশলগত তেল মজুত প্রায় ৫.৩৩ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৪ মিলিয়ন টন সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন রিফাইনারি ও ডিপোতে বাণিজ্যিক মজুতও রয়েছে।

Guns and Oil: Continuity and Change in Russia-India Relations

এই মজুত দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, তবে পরিবহন বিঘ্নের মতো সংকটে কিছু সময়ের জন্য চাপ সামলাতে সহায়তা করতে পারে। এই সময়টুকু ব্যবহার করে ভারত বিভিন্ন উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করে।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভারতের জ্বালানি কৌশল মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে। এটি পশ্চিমবিরোধী নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের বিরুদ্ধেও নয়, আবার শুধুমাত্র রাশিয়ার ওপর নির্ভরতার কৌশলও নয়। বরং বিভিন্ন উৎসের ওপর নির্ভরতা তৈরি করে ঝুঁকি কমানোর একটি বাস্তববাদী নীতি।

ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ছাড়মূল্যের রুশ তেল ব্যবহার করে ভারত দুই অর্থবছরে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পেরেছিল। একই সময়ে রিফাইনারিগুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে তেলের ঘাটতিতে থাকা বাজারে পরিশোধিত পণ্য রপ্তানিও করেছে।

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটেও একই নীতি কার্যকর—বহুমুখী সরবরাহ, বিকল্প পরিবহন পথ এবং বাস্তববাদী কূটনীতি।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রগতি

Q&A: Why India Is Being Targeted with Russian Oil Import Tariffs, and What  It Will Mean for Markets - Center on Global Energy Policy at Columbia  University SIPA | CGEP %

ভারত জ্বালানি নীতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশটি জি২০ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় রয়েছে, ওইসিডি সংশ্লিষ্ট আলোচনায় অংশ নিচ্ছে এবং ব্রিকস জ্বালানি সংলাপ ও আন্তর্জাতিক সৌর জোটের মাধ্যমে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা বাড়াচ্ছে।

দেশের অভ্যন্তরেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, নতুন গ্যাস প্রকল্প, দেশীয় অনুসন্ধান কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ কৌশল উন্নয়নের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা চলছে।

একই সময়ে বড় জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশগুলোও বর্তমান সংকটকে বড় আকার ধারণ করা থেকে ঠেকাতে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জি৭ দেশগুলোকে জরুরি তেল মজুত ব্যবহারের কথা ভাবতে বলেছে, আর ওপেক প্লাস প্রতিদিন অতিরিক্ত ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বাজারকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে তেল বাজার স্থিতিশীল রাখতে এখন শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কৌশলগত মজুত, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সমন্বয় এবং যৌথ সংকট ব্যবস্থাপনা।

এই পরিবর্তিত বিশ্বে ভারত কেবল ঝুঁকির মুখে পড়া একটি দেশ নয়; বরং নতুন জ্বালানি বাস্তবতার মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার পথও তৈরি করছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দ্বাদশ দিনে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান হামলার তীব্রতা

হরমুজ থেকে মস্কো—বিশ্বের জ্বালানি সংকটের মাঝেও কীভাবে তেল সরবরাহ সামলাচ্ছে ভারত

০৩:১৫:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে ওঠানামা করছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত রাশিয়ার তেল, বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত মজুত ব্যবহার করে জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।

বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থায় ভারতের আত্মবিশ্বাসী অবস্থান

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ভারত এনার্জি উইক সম্মেলনে দেশটির কর্মকর্তারা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরেন। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি ভোক্তা হিসেবে ভারত শুধু বড় বাজারই নয়, বরং অস্থির আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাস্তববাদী নীতির অনুসারী হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাত তীব্র হওয়ায় হরমুজ প্রণালীতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার দাবিকে বাস্তবে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে।

ভারতের জন্য এর তাৎক্ষণিক প্রভাব হলো পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বীমার খরচ বাড়া, সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ। তবে একই সঙ্গে এই সংকট ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের যৌক্তিকতাও স্পষ্ট করেছে—বিভিন্ন উৎস থেকে তেল আমদানি, কৌশলগত মজুত, নমনীয় কূটনীতি এবং কোনো একক জোটের ওপর নির্ভরতা কমানো।

Brent hovers around $70 per barrel - The Nation Newspaper

ব্রেন্ট তেলের দাম ও বৈশ্বিক ঝুঁকি

সংঘাত তীব্র হওয়ার আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলারের কাছাকাছি। পরে তা দ্রুত ৮০ ও ৯০ ডলার ছাড়িয়ে ৯ মার্চ সাময়িকভাবে ১১৯.৫০ ডলারে পৌঁছায়। পরে উত্তেজনা কিছুটা কমার ইঙ্গিত পাওয়ায় দাম নেমে আসে প্রায় ৯২.৪৫ ডলারে।

এই ওঠানামা দেখায় যে বর্তমান তেল বাজারের ঝুঁকি শুধু সরবরাহের ঘাটতি নয়, বরং তেল পরিবহনের পথ ও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথগুলোর নিরাপত্তা।

ঝুঁকিপূর্ণ বাজারে চাহিদার বড় কেন্দ্র ভারত

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের ২০৩০ সালের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলতি দশকে বৈশ্বিক তেল চাহিদা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় উৎস হবে ভারত। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির তেল চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ ব্যারেল বাড়তে পারে, যা বৈশ্বিক মোট চাহিদা বৃদ্ধির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।

দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। পেট্রোল, বিমান জ্বালানি এবং এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

এই বড় চাহিদা ভারতকে শক্তিশালী অবস্থান দিলেও ঝুঁকিও বাড়ায়। কারণ দেশটি তার অধিকাংশ তেলই আমদানি করে। প্রতি মাসে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার হওয়ায় তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় বা বীমা খরচ সামান্য বাড়লেও তা দ্রুত মুদ্রাস্ফীতি, সরকারি ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের বাজেটে প্রভাব ফেলতে পারে।

India to amp up energy diplomacy; Petroleum minister Puri to visit US, UAE  | Mint

ভারতের জ্বালানি মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরি সতর্ক করেছেন যে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এখন অনেকটা যুদ্ধকালীন বাস্তবতার মুখোমুখি। তেলের ঝুঁকি প্রিমিয়াম বেড়েছে, ট্যাংকার বীমা খরচ বাড়ছে, সমুদ্রপথ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে এবং ভারতের তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা এখন প্রায় ৮৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০.৯ মিলিয়ন ব্যারেল পেট্রোলিয়াম পরিবাহিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক ব্যবহারের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ।

ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং এর বড় অংশই এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।

যুদ্ধঝুঁকির কারণে জাহাজ বীমা প্রিমিয়াম সাধারণত জাহাজের মূল্যের প্রায় ০.২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ০.৫ শতাংশের বেশি হতে পারে। এতে একটি বড় তেলবাহী ট্যাংকারের একবার যাত্রায় অতিরিক্ত প্রায় দুই লাখ ডলার খরচ যোগ হতে পারে। ফলে শুধু তেলের দাম নয়, তেল পরিবহনের খরচ ও অনিশ্চয়তাও বেড়ে যায়।

তবুও এখন পর্যন্ত ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে গেলেও ভারত সরকার তাৎক্ষণিকভাবে পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা কম। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানিগুলো সাময়িকভাবে কিছু ক্ষতি বহন করে দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে।

আগের সময়ে তুলনামূলক কম দামের সুযোগে এই কোম্পানিগুলো কিছু আর্থিক সঞ্চয় গড়ে তুলেছিল, যা এখন বাজারের ধাক্কা সামলাতে কাজে লাগছে।

India will diversify energy supplies after deal with US on Russia oil  imports - The Economic Times

রুশ তেল ও সরবরাহ বৈচিত্র্যের কৌশল

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধান কৌশল হচ্ছে সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করা। ২০২২ সালের আগে ভারতের মোট তেল আমদানির মাত্র ২ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে। কিন্তু ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী হয়ে ওঠে এবং কখনো কখনো ভারতের মোট আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই রাশিয়া থেকে আসে।

ছাড়মূল্যের রুশ ‘ইউরাল’ তেল ভারতের রিফাইনারিগুলোর মুনাফা বাড়াতে এবং আমদানি ব্যয় কমাতে সহায়তা করেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ভারত ও রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলারে।

তবে এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে ভারত উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা ছেড়ে দিয়েছে। ইরাক, সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনো ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রুড ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি এবং পশ্চিম আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকেও সুযোগ অনুযায়ী তেল কেনা অব্যাহত রয়েছে।

এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে দ্রুত সরবরাহের উৎস পরিবর্তনের সক্ষমতা তৈরি করা।

সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাব

Reliance buys 6 million barrels of Russian oil for March: Report

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারতীয় রিফাইনারিগুলো মার্চ মাসের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৬ মিলিয়ন ব্যারেল রুশ তেল সংগ্রহ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশে সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় এটি সহায়ক হয়েছে।

শিল্প সূত্র বলছে, রাশিয়া প্রয়োজনে প্রায় ৯.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ভারতের দিকে পাঠাতে পারে। এর একটি অংশ এমন রুট দিয়ে আসে যা হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে যায়—যেমন সুয়েজ খাল বা আর্কটিক ও আটলান্টিক মহাসাগরীয় পথ। এতে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর না হলেও কিছুটা কমে।

যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ দিনের বিশেষ ছাড় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এই ছাড় মূলত ইতিমধ্যে লোড হয়ে সমুদ্রপথে থাকা কিছু রুশ তেলের চালানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এটি কেবল লেনদেনের অনিশ্চয়তা কমাতে একটি সাময়িক ব্যবস্থা।

বাস্তবে নিষেধাজ্ঞার সময়েও রুশ তেল ভারতের রিফাইনারিগুলোতে পৌঁছাতে থাকে, কারণ ভারতের ক্রয় সিদ্ধান্ত প্রধানত নির্ভর করে দাম, প্রাপ্যতা এবং সরবরাহের নিরাপত্তার ওপর।

কৌশলগত মজুত ও প্রস্তুতি

ভারত বর্তমানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বিত জরুরি তেল মজুত ছাড় কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে না। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান মজুত পরিস্থিতি আপাতত যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারতের কৌশলগত তেল মজুত প্রায় ৫.৩৩ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৪ মিলিয়ন টন সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন রিফাইনারি ও ডিপোতে বাণিজ্যিক মজুতও রয়েছে।

Guns and Oil: Continuity and Change in Russia-India Relations

এই মজুত দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, তবে পরিবহন বিঘ্নের মতো সংকটে কিছু সময়ের জন্য চাপ সামলাতে সহায়তা করতে পারে। এই সময়টুকু ব্যবহার করে ভারত বিভিন্ন উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করে।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভারতের জ্বালানি কৌশল মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে। এটি পশ্চিমবিরোধী নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের বিরুদ্ধেও নয়, আবার শুধুমাত্র রাশিয়ার ওপর নির্ভরতার কৌশলও নয়। বরং বিভিন্ন উৎসের ওপর নির্ভরতা তৈরি করে ঝুঁকি কমানোর একটি বাস্তববাদী নীতি।

ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ছাড়মূল্যের রুশ তেল ব্যবহার করে ভারত দুই অর্থবছরে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পেরেছিল। একই সময়ে রিফাইনারিগুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে তেলের ঘাটতিতে থাকা বাজারে পরিশোধিত পণ্য রপ্তানিও করেছে।

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটেও একই নীতি কার্যকর—বহুমুখী সরবরাহ, বিকল্প পরিবহন পথ এবং বাস্তববাদী কূটনীতি।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রগতি

Q&A: Why India Is Being Targeted with Russian Oil Import Tariffs, and What  It Will Mean for Markets - Center on Global Energy Policy at Columbia  University SIPA | CGEP %

ভারত জ্বালানি নীতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশটি জি২০ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় রয়েছে, ওইসিডি সংশ্লিষ্ট আলোচনায় অংশ নিচ্ছে এবং ব্রিকস জ্বালানি সংলাপ ও আন্তর্জাতিক সৌর জোটের মাধ্যমে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা বাড়াচ্ছে।

দেশের অভ্যন্তরেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, নতুন গ্যাস প্রকল্প, দেশীয় অনুসন্ধান কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ কৌশল উন্নয়নের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা চলছে।

একই সময়ে বড় জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশগুলোও বর্তমান সংকটকে বড় আকার ধারণ করা থেকে ঠেকাতে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জি৭ দেশগুলোকে জরুরি তেল মজুত ব্যবহারের কথা ভাবতে বলেছে, আর ওপেক প্লাস প্রতিদিন অতিরিক্ত ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বাজারকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে তেল বাজার স্থিতিশীল রাখতে এখন শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কৌশলগত মজুত, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সমন্বয় এবং যৌথ সংকট ব্যবস্থাপনা।

এই পরিবর্তিত বিশ্বে ভারত কেবল ঝুঁকির মুখে পড়া একটি দেশ নয়; বরং নতুন জ্বালানি বাস্তবতার মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার পথও তৈরি করছে।