ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন মোড় নিয়েছে নির্বাচনী দৌড়। আসন্ন নির্বাচনের আগে বিরোধী শিবিরে বড় ধরনের জোট গড়ে তোলার উদ্যোগে একসঙ্গে এসেছেন সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদ। তাদের এই রাজনৈতিক একত্রীকরণকে ঘিরে দেশজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
জোট গঠনের মাধ্যমে নির্বাচনী সূচনা
এপ্রিলের শেষ দিকে দুই নেতা ঘোষণা দেন, তারা নিজেদের দল একত্রিত করে বেনেটের নেতৃত্বে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছেন। লক্ষ্য একটাই—দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে পরাজিত করা এবং নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। আগামী অক্টোবরের নির্বাচনের আগে এই জোট আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ

গত কয়েক বছরে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা জমে উঠেছে। কঠোর ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল এই সরকার দেশকে একাধিক ব্যয়বহুল সংঘাতে জড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সাংবিধানিক সংকট, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ঘুষ ও জালিয়াতির মামলাও রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। এসব কারণে জনমতেও তার জোটের জনপ্রিয়তা কমে এসেছে।
ঐক্যবদ্ধ ক্ষমতাসীন বনাম বিভক্ত বিরোধী শিবির
নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তার সমর্থকদের ঐক্য। বিপরীতে বিরোধী শিবিরে রয়েছে বিভাজন ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব। একাধিক নেতা নিজেকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছেন, ফলে একক নেতৃত্বে ঐক্য গড়া কঠিন হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় বেনেট-লাপিদের নতুন জোট সেই বিভাজন কমানোর চেষ্টা করছে।
ভিন্ন মতাদর্শ, এক লক্ষ্য
বেনেট মূলত ডানপন্থী রাজনীতির প্রতিনিধি, অন্যদিকে লাপিদ মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত। মতাদর্শে ভিন্নতা থাকলেও অতীতে তারা একসঙ্গে কাজ করে সফল হয়েছেন। ২০২১ সালে বিভিন্ন মতের দল নিয়ে তারা একটি জোট সরকার গঠন করে সাময়িকভাবে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে সক্ষম হন। তবে সেই সরকার খুব বেশিদিন টেকেনি।

নতুন জোটের চ্যালেঞ্জ
নতুন এই জোটের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আরও দলকে সঙ্গে আনা এবং অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সামলানো। বিশেষ করে আরব দলগুলোকে জোটে অন্তর্ভুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, যদিও তারা দেশের উল্লেখযোগ্য একটি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।
নির্বাচনী ইস্যুতে পরিবর্তন
এই জোট মূলত নেতানিয়াহুর সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরতে চাইছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার পেছনের দায় এবং সামরিক সেবায় বৈষম্যের বিষয়টি তারা সামনে আনছে। অনেক ইসরায়েলির মধ্যে এই বিষয়গুলো নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে, যা নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সামনে কী

ইসরায়েলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় বড় দলগুলোর সুবিধা বেশি। তাই এই জোটকে শক্তিশালী করতে আরও প্রভাবশালী নেতাদের যুক্ত করা জরুরি। জনপ্রিয় সাবেক জেনারেল গাদি আইজেনকটের মতো নেতাদের সিদ্ধান্ত এই নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, মতাদর্শগত বিভাজন থাকা জোট দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন। ফলে নির্বাচনের ফলাফল যেমন অনিশ্চিত, তেমনি রাজনৈতিক ভবিষ্যতও অনেকটাই নির্ভর করছে এই নতুন জোট কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের ঐক্য ধরে রাখতে পারে তার ওপর।
ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের জটিল ইস্যুগুলো—বিশেষ করে ফিলিস্তিন প্রশ্ন ও গাজা পরিস্থিতি—এবারও নির্বাচনী আলোচনার বাইরে থেকে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে তাই আবারও দেখা যাচ্ছে জোট, বিভাজন আর ক্ষমতার লড়াইয়ের এক জটিল সমীকরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















