গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মধ্যে ফিলিস্তিনি নারীদের এমন অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে যেখানে তারা নিরাপদে বেঁচে থাকা বা সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো মৌলিক শর্ত থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন—এমন অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধের কারণে গাজায় নারী ও কিশোরীরা চরম সংকটের মুখে পড়েছেন। ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধ্বংস এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
নারী ও কিশোরীদের লক্ষ্য করে ‘পরিকল্পিত যুদ্ধ’
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি জানায়, গাজায় নারীদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ ক্রমাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কেবল যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়; বরং নারী ও কিশোরীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত যুদ্ধনীতি।
অ্যামনেস্টি বলেছে, ইসরায়েলের ধারাবাহিক নীতির মধ্যে রয়েছে ব্যাপক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, প্রয়োজনীয় পণ্য ও মানবিক সহায়তার ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা এবং দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা নিরবচ্ছিন্ন বোমাবর্ষণ। এসব কারণে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং অসংখ্য পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে।

যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের পর এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেই সময়ের পর থেকে আরও ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
এছাড়া গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথেও নানা বাধা তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের কারণে এখনও লাখ লাখ মানুষ গাজার বিভিন্ন এলাকায় বাস্তুচ্যুত অবস্থায় বসবাস করছেন।
স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক দপ্তর জানিয়েছে, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও জ্বালানির ঘাটতির কারণে গাজার স্বাস্থ্যখাত এখনও গুরুতর সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে।

সংস্থাটি জানায়, গাজায় প্রতিদিন প্রায় ১৮০ জন নারী সন্তান জন্ম দেন। কিন্তু অবকাঠামো ধ্বংস, প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব এবং রোগী স্থানান্তরের সীমিত সুযোগের কারণে মাতৃত্ব ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শয্যা সংকট এতটাই তীব্র যে অনেক নারী বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাসপাতাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। পরে তাদেরকে অত্যন্ত ভিড়পূর্ণ বাস্তুচ্যুত শিবিরে ফিরে যেতে হচ্ছে, ফলে সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি বাড়ছে।
মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, গত প্রায় ২৯ মাসে গাজায় মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, অকাল জন্ম, কম ওজনের শিশু, শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত নবজাতক, গর্ভবতী নারীদের অপুষ্টি এবং প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গাজা সিটির আল হেলু হাসপাতালে কর্মরত নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডা. নাসের বুলবুল জানান, বাস্তুচ্যুতির কারণে নানা সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণের সংখ্যা বাড়ছে।
তিনি বলেন, অধিকাংশ নারী তীব্র মানসিক চাপ, ট্রমা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে হাসপাতালে আসছেন। অনেকেই একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, প্রিয়জন হারিয়েছেন এবং পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার সুযোগ নেই।
এক মায়ের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা
উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের এক ২২ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নারী জানিয়েছেন, গত জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তিনি যখন একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন, তখন তার ওজন ছিল মাত্র ৪৩ কেজি।
তার নবজাতক শিশুটি জন্মের পর দুই ফুসফুসে সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। কয়েকদিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকার পর কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও সে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছে না এবং ইনকিউবেটরে রাখা হয়েছে।
বর্তমানে তিনি দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি তাঁবুতে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছেন।
তিনি বলেন, “সমুদ্রের ধারে তাঁবুতে থাকি। প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ছে, গরম থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। আমি ভয় পাচ্ছি আমার শিশুটি আবার অসুস্থ হয়ে পড়বে। আমার আরও ১৮ মাসের একটি সন্তান আছে, সেও ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে।”

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















