জাপানের রাজনীতিতে ‘গোল্ডেন উইক’ এখন কেবল ছুটির মৌসুম নয়, এটি ধীরে ধীরে এক ধরনের কূটনৈতিক প্রদর্শনীর সময়েও পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর এই সময়েই প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের বিদেশ সফরের হিড়িক দেখা যায়। এবারের দৃশ্য আরও বড়। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও তাঁর মন্ত্রীরা এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে সফর করেছেন। সফরের পরিধি এতটাই বিস্তৃত ছিল যে সেটিকে অনেকেই জাপানের নতুন কৌশলগত কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যস্ততা কি কৌশলের সমার্থক? বহু দেশে সফর, অসংখ্য বৈঠক এবং নানা চুক্তির ঘোষণা কি সত্যিই সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রনীতি নির্দেশ করে, নাকি এটি কেবল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার তাড়াহুড়া?
জাপানের সাম্প্রতিক এই কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা টোকিওকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ফলে তেল, গ্যাস, বিরল খনিজ, সার এবং অন্যান্য কৌশলগত পণ্যের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন জাপানের কূটনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে।
ভিয়েতনামে তাকাইচির সফরে তেল শোধনাগার উন্নয়ন এবং বিরল খনিজ সরবরাহ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রকল্প ও জ্বালানি সহযোগিতা আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি এসেছে। আফ্রিকায় তামা ও কোবাল্ট পরিবহন নিয়ে আলাপ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি মজুত এবং তেলের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৃষি ও শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা হয়েছে।
এসব উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো আসলে শিনজো আবের সময়কার ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার নতুন সংস্করণ, যেখানে নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সমুদ্রপথ নিরাপত্তা এবং সামরিক প্রযুক্তি বিনিময়ের প্রশ্নও সামনে আসছে।
কাগজে-কলমে দেখলে সবকিছুই কৌশলগত মনে হয়। কিন্তু বাস্তব কূটনীতির জন্য কেবল উদ্দেশ্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সময় নির্বাচন এবং ধারাবাহিকতা। এখানেই জাপানের বর্তমান পদ্ধতির দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এক সপ্তাহে এত বিপুলসংখ্যক উচ্চপর্যায়ের সফর আয়োজন কার্যত কূটনীতিকে প্রশাসনিক রুটিনে নামিয়ে আনে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সময় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন মুহূর্তে কোন দেশে যাওয়া হবে, কাদের সঙ্গে বৈঠক হবে, কোন আলোচনাকে আগে গুরুত্ব দেওয়া হবে—এসবই কৌশলের অংশ। অথচ জাপানের সাম্প্রতিক তৎপরতায় সেই সূক্ষ্ম পরিকল্পনার বদলে এক ধরনের গাদাগাদি কূটনীতি দেখা গেছে।
এর পেছনে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাও আছে। জাপানি মন্ত্রীরা প্রায়ই যুক্তি দেন যে পার্লামেন্ট অধিবেশন চলাকালে বিদেশ সফর করা কঠিন। ফলে গোল্ডেন উইকের মতো ছুটির সময়েই অধিকাংশ সফর গুঁজে দিতে হয়। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই ব্যাখ্যা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
জাপানে উপমন্ত্রী ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিদের যে কাঠামো রয়েছে, তা মূলত মন্ত্রীদের অনুপস্থিতিতেও সরকারের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্যই তৈরি। তাহলে কেন এখনো বিদেশনীতি পার্লামেন্টের সময়সূচির কাছে এতটা বন্দি থাকবে?
এই প্রশ্নের উত্তর জাপানের প্রশাসনিক সংস্কৃতির গভীরে লুকিয়ে আছে। দেশটি এখনো এমন একটি কাঠামোয় আটকে আছে যেখানে কূটনৈতিক নমনীয়তার চেয়ে অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষণশীলতা বেশি প্রভাবশালী। ফলে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে টোকিও প্রায়ই পিছিয়ে পড়ে।
চীনের দিকে তাকালে পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয়। চীনা নেতারা আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সফর করেন, ধারাবাহিকভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং রাজনৈতিক উপস্থিতি বজায় রাখেন। জাপান এখন আফ্রিকার দিকে নতুন আগ্রহ দেখালেও বাস্তবতা হলো, এত বড় মহাদেশে জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সফর ইতিহাসে খুবই সীমিত।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রশ্নে জাপানের উদ্বেগ বাস্তব। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতায় বিকল্প জ্বালানি উৎস, খনিজ সরবরাহ এবং নতুন অংশীদার খোঁজা জরুরি। কিন্তু কৌশলগত কূটনীতি মানে কেবল একসঙ্গে অনেক দরজায় কড়া নাড়া নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুসংহত পরিকল্পনা, সময়জ্ঞান এবং এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো, যা নেতাদের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার সুযোগ দেয়।
জাপানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা দেশটির উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখিয়েছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর কৌশল এক জিনিস নয়। কূটনীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন রাষ্ট্র তার লক্ষ্যকে সময়, কাঠামো ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পরিচালনা করতে পারে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে সক্রিয়তা দেখা গেলেও তার প্রভাব স্থায়ী হয় না।
জাপানের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ সফরের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং কূটনীতিকে সত্যিকারের কৌশলগত রূপ দেওয়া। সেই সংস্কার ছাড়া এই ধরনের তৎপরতা দেখাতে যতই বড় মনে হোক, ভেতরে ভেতরে তা থেকে যাবে অগোছালো এবং অসম্পূর্ণ।
কুনি মিয়াকে 


















