০৭:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
ব্যারাকই শুধু শুরু, একের পর এক স্থানে অভিবাসী আবাসনের ঘোষণা মাহমুদের মৌনি রায়ের পুরোনো দিন ফিরে দেখা, দুই হাজার সাতের অডিশনের অদেখা ভিডিওতে আবেগঘন স্মৃতি নেতাজির পরাক্রম আজও জীবন্ত, আলোকিত করে জাতির পথচলা ১৬ বছরের নিচে সামাজিক মাধ্যম বন্ধে অন্ধ্রের ভাবনা, মন্ত্রিসভার বিশেষ কমিটি গঠন সাংবাদিকদের প্রশ্নে নীরব বিসিসিআই সভাপতি, বাংলাদেশ ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান নেই ভারতের শিশু নির্যাতনের অভিযোগে শারমিন একাডেমির প্রশাসনিক কর্মকর্তা গ্রেপ্তার বিশ্ব অস্থিরতার যুগে ভারত-ইইউ ঘনিষ্ঠতা বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতি দিতে পারে: জয়শঙ্কর ডলারের বিপরীতে নতুন তলানিতে রুপি, বাজারে বাড়ছে অনিশ্চয়তা ইরানকে অর্ধশতক ধরে পিছিয়ে রেখেছে এই মোহ ট্রাম্পের আর্কটিক নাটক ও বৈশ্বিক বাজারে শীতল হাওয়া

স্বর্ণসহ যে পাঁচ খাতে বিনিয়োগ তুলনামূলক নিরাপদ হতে পারে

বাংলাদেশের একটি ইন্স্যুরেন্স (বীমা) কোম্পানিতে এক দশকেরও বেশি সময় আগে বীমা বাবদ টাকা রাখতে শুরু করেছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী বাংলাদেশি শফিকুল ইসলাম। ধীরে ধীরে সেই বীমার অংক প্রায় ১০ লাখে পৌঁছুলে তিনি সেই অর্থ তুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর হতে চলছে, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা ওই ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, টাকা আর তুলতে পারছেন না।

বিদেশ-বিভুঁইয়ে পরিবার-পরিজনহীন অবস্থায় উপার্জিত তার এই ঘামঝরা অর্থ বছরের পর বছর এভাবে আটকে থাকায় প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়েছেন তিনি। এখন তার মনে হয়, এই টাকা দিয়ে যদি স্বর্ণ কিংবা কতগুলো সঞ্চয়পত্র কিনে রাখতেন, তাহলে তা অন্তত তার হাতে থাকতো।

শফিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতা একক কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণ, আর্থিক অনিয়ম এবং কাঠামোগত দুর্বলতা সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি উদ্বেগ তৈরি করেছে যে, তাদের টাকা কোথায় নিরাপদ?

এই প্রেক্ষাপটে সঞ্চয়ের প্রশ্ন এলে স্বর্ণসহ বেশ কয়েকটি খাত বারবার আলোচনায় আসে।

কখনো মূল্যস্ফীতি, কখনো মুদ্রার অবমূল্যায়ন, আবার কখনো ব্যাংকিং আস্থার সংকট বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন কারণে মানুষ এসব খাতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

তবে এগুলো কতটা নিরাপদ, কেন বিনিয়োগকারীরা এগুলোর দিকে আগ্রহী হন এবং কোথায় ঝুঁকি – সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই বিশ্লেষণ।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রায় ১৫ টন সোনার রিজার্ভ রয়েছে
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রায় ১৫ টন সোনার রিজার্ভ রয়েছে

স্বর্ণ: অস্থির সময়ে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়

বাংলাদেশে ও বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। দেশের বাজারে এখন ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দুই লাখ ৫২ হাজার ৪৬৭ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাম।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম লাখের ঘরে পৌঁছায়।

মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আড়াই লাখের বেশি টাকায়।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা স্বর্ণের দাম শুধু বাড়তেই দেখেছেন, কমতে না। কমলেও সেই হার বাড়ার হারের তুলনায় যৎসামান্য। তাদের মতে, স্বর্ণের দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই।

বাজুস-এর স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং এন্ড প্রাইস মনিটরিং-এর চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, তিনি নব্বইয়ের দশকের শুরুতে স্বর্ণের ব্যবসা শুরু করেন এবং তখন স্বর্ণের দাম ছিল ভরিপ্রতি চার হাজার ৮৫০ টাকা।

“আম্মার বিয়ের সময় ছিল ৮০ টকা। এরপর এটা বাড়তে বাড়তে ১০ হাজার, ৫০ হাজার, এক লাখ হলো। এখন আড়াই লাখ। মানি ডিভ্যালুয়েশনের জন্য গতকাল এটা পাঁচ লাখ ক্রস করছে” বলেন মি. শাহীন।

মূলত, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে স্বর্ণের দাম নিবিড়ভাবে যুক্ত। অর্থাৎ, বিশ্বে সাধারণত যুদ্ধ কিংবা অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি তৈরি হলে স্বর্ণের দামে এক ধরনের প্রভাব পড়ে।

মি. শাহীনের ভাষায়, “স্বর্ণ এমন একটি জিনিস, যা অপেক্ষা করে দুঃসংবাদের জন্য। বিশ্বে কোনো অস্থিরতা দেখা দিলেই স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়। যখন সুবাতাস দেখা যায়, তখন কিছুটা কমে।”

এসব কারণেই বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার এবং অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি সোনাও বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বা রিজার্ভ হিসেবে জমা থাকে।

ঐতিহাসিকভাবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ স্বর্ণ দিয়েই গঠিত হতো এবং অতীতে একটি দেশের মুদ্রার মানও সেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত স্বর্ণের ভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করতো।

পিওর গোল্ডে বিনিয়োগ সবচেয়ে নিরাপদ, বলছে খাত সংশ্লিষ্টরা
পিওর গোল্ডে বিনিয়োগ সবচেয়ে নিরাপদ, বলছে খাত সংশ্লিষ্টরা

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের বৃহত্তম সোনার রিজার্ভ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মোট আট হাজার ১৩৩ টন (৮১ লক্ষ কিলোগ্রামের বেশি) সোনা আছে, যা তাদের মোট বিদেশি সম্পদের ৭৮ শতাংশ। এদিকে, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১৪ দশমিক আট টন (১৪ হাজার ৮০০ কিলোগ্রাম) স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে।

সুতরাং, টাকার মান কমে গেলে বা ব্যাংক খাতে অনাস্থা এসে গেলে সাধারণ মানুষও স্বর্ণে বিনিয়োগ বাড়ান। কারণ স্বর্ণের মূল্য সরকারের সিদ্ধান্ত বা কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে না। অর্থাৎ, কোনো দেশের সরকার বা ব্যাংক সংকটে পড়লেও স্বর্ণ নিজে একটি আলাদা সম্পদ হিসেবেই থাকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

তাই, বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টরা বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণকেই সবচেয়ে নিরাপদ মনে করছেন।

কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মাঝে গয়না কেনার প্রবণতাটাই সাধারণত বেশি।

এ বিষয়ে দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলছিলেন, “স্বর্ণের গহনার মূল্য অবশ্যই আছে। কিন্তু পিওর গোল্ড আদিকাল থেকে বিনিয়োগের একটি অংশ। পিওর গোল্ড মানে ২৪ ক্যারেট। তাই, স্বর্ণে বিনিয়োগের কথা চিন্তা করলে পিওর গোল্ডের কয়েন বা বার কেনা উচিৎ।”

তিনি বলছিলেন, “বাংলাদেশের পুরাণ ঢাকার তাঁতি বাজারে পিওর গোল্ড কিনতে পাওয়া যায়। আর সাধারণত প্রবাসী বাঙালিরা ব্যাগেজ রুলের আওতায় সর্বোচ্চ দশ ভরি পর্যন্ত স্বর্ণের বার নিয়ে আসতে পারে বাংলাদেশে। তাদের কাছ থেকে কেনা যায়। এটা একটি ইনভেস্টমেন্ট।”

তবে স্বর্ণে বিনিয়োগে কিছুটা সতর্কও থাকা প্রয়োজন। কারণ স্বর্ণের দাম কিছুটা হলেও ওঠানামা করে। সেইসাথে, এটি আবার কোনো সুদ বা নিয়মিত আয় দেয় না।

বাংলাদেশে সীমিত আয়ের মানুষদের কাছে সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়
বাংলাদেশে সীমিত আয়ের মানুষদের কাছে সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়

সঞ্চয়পত্র: রাষ্ট্রের নিশ্চয়তার ভরসা

বাংলাদেশের বেশিরভাগ ব্যাংকই এখন দুর্বল অবস্থায় আছে। তাই, বাংলাদেশে ব্যাংকে টাকা রাখতে অনেকে নিরাপদবোধ করছে না বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

তার মতে, স্বর্ণে বিনিয়োগের জন্য অন্যতম নিরাপদ জায়গা এখন এবং স্বর্ণের পর হলো সঞ্চয়পত্রের অবস্থান। “কারণ সঞ্চয়পত্র সরকারের কাছ থেকে আসে, তাই এটি নির্ভরযোগ্য।”

কিন্তু সেখানেও তো সীমা দেওয়া আছে। সবাই সঞ্চয়পত্র কিনলে সরকারকে তো সুদসহ সেগুলো ফেরত দিতে হবে, সঞ্চয়পত্রের সংকটের বিষয়ে বলছিলেন ফাহমিদা খাতুন।

সেজন্যই ২০২৬ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩০শে জুন পর্যন্ত সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়েছিলো সরকার। এতে সীমিত আয়ের বিনিয়োগকারীরা বিপাকে পড়ে যান। পরবর্তীতে ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরকার।

মূলত, নিরাপদ সঞ্চয় এবং মুনাফার হার বেশি থাকায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের একটি প্রচলিত খাত হল সঞ্চয়পত্র।

সঞ্চয়পত্র ইস্যু করে থাকে বাংলাদেশ সরকার, তাই মেয়াদ শেষে মুনাফাসহ বিনিয়োগকৃত টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে।

পাশাপাশি, এই খাতে নির্দিষ্ট হারে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর কমানোর সুযোগ রয়েছে।

কোথায় বিনিয়োগ করছেন তা ভালোভাবে না বুঝলে বিনিয়োগ না করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
কোথায় বিনিয়োগ করছেন তা ভালোভাবে না বুঝলে বিনিয়োগ না করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

কোনো করদাতার করযোগ্য বার্ষিক আয় যদি হয় ১০ লাখ টাকা, এর মধ্যে তিনি আয়ের ২০ শতাংশ বা দুই লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনলে তিনি তার প্রদেয় করের ওপর সর্বোচ্চ ছাড় পাবেন।

যে বছর বিনিয়োগ করবেন শুধুমাত্র ওই বছরেই তার উপর কর রেয়াত সুবিধা নিতে পারবেন।

তবে তিনি যে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করবেন তার অর্থ মেয়াদ পূর্তির আগে উত্তোলন করা যাবে না। সহজ করে বললে, যদি কেউ পাঁচ বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন, তাহলে সেটা মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভাঙানো যাবে না। ওই সময়ের আগে কেউ নগদায়ন করে ফেললে করদাতা যে টাকার কর রেয়াত সুবিধা নিয়েছিলেন, তা বাতিল হয়ে যাবে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীন যত ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্র। এতে সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে প্রায় ১২ শতাংশ মুনাফা মিলে। সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পেনশন সঞ্চয়পত্রেও প্রায় কাছাকাছি মুনাফা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে অবসরপ্রাপ্ত মানুষ, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর কাছে সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়।

এটা কেনা যাবে সকল সরকারি, বেসরকারি ব্যাংকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয়, ডাকঘর এবং সঞ্চয় ব্যুরো কার্যালয়ে।

অনেক ব্যাংক রয়েছে যারা সঞ্চয়পত্র করার সকল ঝামেলার কাজ, সুদের টাকা সরাসরি ব্যাংকে অ্যাকাউন্টে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জমির দামে রয়েছে পার্থক্য।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জমির দামে রয়েছে পার্থক্য

জমি ও আবাসন: দৃশ্যমান সম্পদের আকর্ষণ

দীর্ঘমেয়াদে জমির দাম সাধারণত কমে না, বরং বাড়তেই থাকে ‒ এই বিশ্বাস বহুদিনের।

ড. ফাহমিদা খাতুনও বলছিলেন, “জমি বা রিয়েল স্টেটে বিনিয়োগ করতে পারে। কারণ বাংলাদেশে মানুষ বেশি, জায়গা কম। এটাতে সবসময়ই ঊর্ধ্বমুখী এর দাম। একটা দেশের অর্থনীতি খারাপ হলেও জমির দাম কখনও কমে না সাধারণত।”

জমি কিংবা আবাসনে বিনিয়োগের একটি সামাজিক ও মানসিক দিকও আছে। অনেকের কাছে এটি শুধু বিনিয়োগ নয়, বরং নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতীক।

অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় দৃশ্যমান সম্পদে বিনিয়োগ মানুষকে মানসিক স্বস্তি দেয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, জমি বা রিয়েল এস্টেটের বড় ঝুঁকি হলো তারল্যের অভাব। কারণ জরুরি প্রয়োজনে এগুলো দ্রুত বিক্রি করা কঠিন।

আবার, বাজার স্থবির হলে দাম দীর্ঘদিন আটকে থাকতে পারে এবং শহরে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ফ্ল্যাট বা বাড়ি তৈরি হয়ে গেলে সেগুলো বিক্রি বা ভাড়া দিতেও সমস্যা হতে পারে।

এছাড়া, জমি কেনার আগে ভবিষ্যতে দাম বাড়বে এরকম জায়গা যদি নির্বাচন করা যায়, তাহলে আরও লাভ। আর জমিতে কোনো ঝামেলা আছে কিনা সেটি ভালো করে খবর নিয়ে দেখতে হবে। কোনো ভুয়া লোকের খপ্পরে পড়লেই বিপদ।

জমির মাটি উঁচু ভবন তৈরি করার মতো কি না, আশপাশে কোন স্থাপনার জন্য জমির দাম বাড়তে পারে কি না, জমির কাছে রাস্তা আছে কি না, ড্রেইনেজ সিস্টেম তৈরি হয়েছে কি না, এলাকাটি ভবিষ্যতে উন্নত হবে কি না – এসব যাচাই করেই জমি কেনা উচিৎ।

"যেকোনো ব্যাংকে" টাকা রাখা উচিৎ নয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা
যেকোনো ব্যাংকে” টাকা রাখা উচিৎ নয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা

ডিপিএস: ব্যাংকের ‘হেলথ’ বুঝে সিদ্ধান্ত

ডিপোজিট পেনশন স্কিমে মানুষ নিজের টাকা সঞ্চয় করেন, যার বিনিময়ে সুদ পান। কিছু ব্যাংক সাত থেকে সাড়ে সাত শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা দিয়ে থাকে।

এতে ব্যক্তি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য, যেমন – তিন, পাঁচ বা দশ বছরের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ জমা রাখবেন। নানা ব্যাংকে মাসে একশ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা দেয়া যায়।

কোনো কোনো ব্যাংক প্রতি মাসে সুদ দিয়ে থাকে, আবার কোনো ব্যাংক তিন মাস বা ছয় মাস অন্তর সুদ দেয়। এছাড়া, এককালীন ডিপিএস রয়েছে, যার সুদ মেয়াদ শেষে পাওয়া যায়।

সমস্যা হলো, ডিপিএসে সেভিংস অ্যাকাউন্টের মতো যখন তখন টাকা তোলা যাবে না।

ফাহমিদা খাতুন বলছিলেন, “ডিপিএস করা যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যাংকের হেলথ বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোন ব্যাংকে টাকাটা রাখা হচ্ছে, সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি বলছিলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোতে মুনাফা অনেকসময় কম থাকে। “কারণ সরকার নির্ভর হয়ে গেলে সরকারের ওপর চাপ পড়ে যায় তখন। সেজন্য সরকার ইন্টারেস্ট কমিয়ে দিতে চায়। তবে প্রাইভেট ব্যাংকে প্যাকেজ থাকে, সেগুলোর হেলথ দেখে বিনিয়োগ করতে হবে।”

তিনি আবার জোর দিয়ে বলেন, “যেকোনো ব্যাংকে” টাকা রাখা উচিৎ নয়। কারণ দেখা গেল যে ব্যাংক টাকাটা নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সে আর সময়মতো তা ফেরত দিতে পারছে না।

তাই, এক্ষেত্রে “ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি জরুরি” বলে মত মিজ খাতুনের।

সাধারণত বিভিন্ন মেয়াদে ও সুদে সরকার ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে থাকে
সাধারণত বিভিন্ন মেয়াদে ও সুদে সরকার ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে থাকে

সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও বিল: এখনও নিরাপদ

ফাহমিদা খাতুন বলছিলেন, “সরকারের ট্রেজারি বিল, এগুলো নিরাপদ।”

সাধারণত বিভিন্ন মেয়াদে ও সুদে সরকার ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এসব বন্ড নিলামে কেনা-বেচা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছর থেকে শুরু করে ২০ বছর পর্যন্ত মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড রয়েছে। এসব বন্ডে সুদের হার চার থেকে প্রায় আট শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে।

প্রতি ছয় মাস অন্তর মুনাফা তুলে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগের কোনো সীমা নেই।

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎস কর দিতে হয়। ট্রেজারি বন্ডে মুনাফা গ্রহণের সময় পাঁচ শতাংশ কর দিতে হয়।

ট্রেজারি বন্ড কেনা- বেচারও সুযোগ রয়েছে। বিক্রির সময় লাভে বিক্রি করা যায়।

এ বিষয়ে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরী বিবিসিকে বলেছিলেন, কোনো বিষয় না বুঝলে তাতে বিনিয়োগ না করাই ভালো।

“যেমন, ট্রেজারি বন্ড হয়ত সবার জন্য নয়। কারণ এটি নিলামের মাধ্যমে নিতে হয়, কেনার ঝামেলা আছে, এটি সবাই বুঝতে পারে না।”

অনেক সুদের লোভ দেখায় এমন অস্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে চলার পরামর্শ অর্থনীতিবদদের
অনেক সুদের লোভ দেখায় এমন অস্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে চলার পরামর্শ অর্থনীতিবদদের

শেষ কথা: নিরাপদ বিনিয়োগ বলে কিছু নেই

অর্থনীতিবিদরা একবাক্যে বলেন, “নিরাপদ বিনিয়োগ” একটি আপেক্ষিক ধারণা। যে খাত একজনের কাছে নিরাপদ, অন্যজনের জন্য তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সময়, লক্ষ্য, আয় ও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, সবকিছু মিলিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে অব্যবস্থার কারণে মানুষ বিকল্প খুঁজলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, আতঙ্কের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

যেমন, ফাহমিদা খাতুনের মতে, “জীবন বীমা সরকারের, কিন্তু এটা ডেভেলপড না আমাদের দেশে অতটা। এখান থেকে রিটার্ন অতটা ভালো আসে না। হ্যাঁ, কোনো বীমা বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক এককালীন এক লাখ টাকা দিবে, বাকিটাও দিবে, কিন্তু অনেক আস্তে আস্তে।”

তার মতে, “বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল প্রোডাক্টে অত অপশন নাই। অনেক দেশে বন্ড মার্কেট, ক্যাপিটাল মার্কেট থাকে। আমাদের সেই ডাইভারসিফিকেশন নাই। শেয়ার বাজার স্ট্রং না, শেয়ার বাজার ইজ নট আ অপশন। ভালো ইনভেস্টররাই এখানে আসে না।”

অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরীও বলেছিলেন, “শেয়ারবাজার বাংলাদেশে খুবই অস্বচ্ছ একটা জায়গা, বিভিন্ন গ্রুপ ইন্টারনাল ট্রেডিং-এর মাধ্যমে দাম ওঠা নামায় কারসাজি করে।”

“শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে গেলে এটা ভালো করে বুঝতে হয়। সঞ্চয়পত্রের মতো কিনে ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না। অতএব, এখানে বিনিয়োগে সাবধান হতে হবে। আমরা নানা সময়ে দেখেছি যারা শেয়ারবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারা স্বল্প পুঁজির মানুষ।”

এছাড়া, অনেক সুদের লোভ দেখায়, এমন অস্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে চলতেও বলেছিলেন তিনি।

বিবিসি বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্যারাকই শুধু শুরু, একের পর এক স্থানে অভিবাসী আবাসনের ঘোষণা মাহমুদের

স্বর্ণসহ যে পাঁচ খাতে বিনিয়োগ তুলনামূলক নিরাপদ হতে পারে

০৫:৪৩:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের একটি ইন্স্যুরেন্স (বীমা) কোম্পানিতে এক দশকেরও বেশি সময় আগে বীমা বাবদ টাকা রাখতে শুরু করেছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী বাংলাদেশি শফিকুল ইসলাম। ধীরে ধীরে সেই বীমার অংক প্রায় ১০ লাখে পৌঁছুলে তিনি সেই অর্থ তুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর হতে চলছে, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা ওই ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, টাকা আর তুলতে পারছেন না।

বিদেশ-বিভুঁইয়ে পরিবার-পরিজনহীন অবস্থায় উপার্জিত তার এই ঘামঝরা অর্থ বছরের পর বছর এভাবে আটকে থাকায় প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়েছেন তিনি। এখন তার মনে হয়, এই টাকা দিয়ে যদি স্বর্ণ কিংবা কতগুলো সঞ্চয়পত্র কিনে রাখতেন, তাহলে তা অন্তত তার হাতে থাকতো।

শফিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতা একক কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণ, আর্থিক অনিয়ম এবং কাঠামোগত দুর্বলতা সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি উদ্বেগ তৈরি করেছে যে, তাদের টাকা কোথায় নিরাপদ?

এই প্রেক্ষাপটে সঞ্চয়ের প্রশ্ন এলে স্বর্ণসহ বেশ কয়েকটি খাত বারবার আলোচনায় আসে।

কখনো মূল্যস্ফীতি, কখনো মুদ্রার অবমূল্যায়ন, আবার কখনো ব্যাংকিং আস্থার সংকট বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন কারণে মানুষ এসব খাতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

তবে এগুলো কতটা নিরাপদ, কেন বিনিয়োগকারীরা এগুলোর দিকে আগ্রহী হন এবং কোথায় ঝুঁকি – সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই বিশ্লেষণ।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রায় ১৫ টন সোনার রিজার্ভ রয়েছে
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রায় ১৫ টন সোনার রিজার্ভ রয়েছে

স্বর্ণ: অস্থির সময়ে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়

বাংলাদেশে ও বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। দেশের বাজারে এখন ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দুই লাখ ৫২ হাজার ৪৬৭ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাম।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম লাখের ঘরে পৌঁছায়।

মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আড়াই লাখের বেশি টাকায়।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা স্বর্ণের দাম শুধু বাড়তেই দেখেছেন, কমতে না। কমলেও সেই হার বাড়ার হারের তুলনায় যৎসামান্য। তাদের মতে, স্বর্ণের দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই।

বাজুস-এর স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং এন্ড প্রাইস মনিটরিং-এর চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, তিনি নব্বইয়ের দশকের শুরুতে স্বর্ণের ব্যবসা শুরু করেন এবং তখন স্বর্ণের দাম ছিল ভরিপ্রতি চার হাজার ৮৫০ টাকা।

“আম্মার বিয়ের সময় ছিল ৮০ টকা। এরপর এটা বাড়তে বাড়তে ১০ হাজার, ৫০ হাজার, এক লাখ হলো। এখন আড়াই লাখ। মানি ডিভ্যালুয়েশনের জন্য গতকাল এটা পাঁচ লাখ ক্রস করছে” বলেন মি. শাহীন।

মূলত, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে স্বর্ণের দাম নিবিড়ভাবে যুক্ত। অর্থাৎ, বিশ্বে সাধারণত যুদ্ধ কিংবা অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি তৈরি হলে স্বর্ণের দামে এক ধরনের প্রভাব পড়ে।

মি. শাহীনের ভাষায়, “স্বর্ণ এমন একটি জিনিস, যা অপেক্ষা করে দুঃসংবাদের জন্য। বিশ্বে কোনো অস্থিরতা দেখা দিলেই স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়। যখন সুবাতাস দেখা যায়, তখন কিছুটা কমে।”

এসব কারণেই বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার এবং অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি সোনাও বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বা রিজার্ভ হিসেবে জমা থাকে।

ঐতিহাসিকভাবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ স্বর্ণ দিয়েই গঠিত হতো এবং অতীতে একটি দেশের মুদ্রার মানও সেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত স্বর্ণের ভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করতো।

পিওর গোল্ডে বিনিয়োগ সবচেয়ে নিরাপদ, বলছে খাত সংশ্লিষ্টরা
পিওর গোল্ডে বিনিয়োগ সবচেয়ে নিরাপদ, বলছে খাত সংশ্লিষ্টরা

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের বৃহত্তম সোনার রিজার্ভ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মোট আট হাজার ১৩৩ টন (৮১ লক্ষ কিলোগ্রামের বেশি) সোনা আছে, যা তাদের মোট বিদেশি সম্পদের ৭৮ শতাংশ। এদিকে, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১৪ দশমিক আট টন (১৪ হাজার ৮০০ কিলোগ্রাম) স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে।

সুতরাং, টাকার মান কমে গেলে বা ব্যাংক খাতে অনাস্থা এসে গেলে সাধারণ মানুষও স্বর্ণে বিনিয়োগ বাড়ান। কারণ স্বর্ণের মূল্য সরকারের সিদ্ধান্ত বা কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে না। অর্থাৎ, কোনো দেশের সরকার বা ব্যাংক সংকটে পড়লেও স্বর্ণ নিজে একটি আলাদা সম্পদ হিসেবেই থাকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

তাই, বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টরা বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণকেই সবচেয়ে নিরাপদ মনে করছেন।

কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মাঝে গয়না কেনার প্রবণতাটাই সাধারণত বেশি।

এ বিষয়ে দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলছিলেন, “স্বর্ণের গহনার মূল্য অবশ্যই আছে। কিন্তু পিওর গোল্ড আদিকাল থেকে বিনিয়োগের একটি অংশ। পিওর গোল্ড মানে ২৪ ক্যারেট। তাই, স্বর্ণে বিনিয়োগের কথা চিন্তা করলে পিওর গোল্ডের কয়েন বা বার কেনা উচিৎ।”

তিনি বলছিলেন, “বাংলাদেশের পুরাণ ঢাকার তাঁতি বাজারে পিওর গোল্ড কিনতে পাওয়া যায়। আর সাধারণত প্রবাসী বাঙালিরা ব্যাগেজ রুলের আওতায় সর্বোচ্চ দশ ভরি পর্যন্ত স্বর্ণের বার নিয়ে আসতে পারে বাংলাদেশে। তাদের কাছ থেকে কেনা যায়। এটা একটি ইনভেস্টমেন্ট।”

তবে স্বর্ণে বিনিয়োগে কিছুটা সতর্কও থাকা প্রয়োজন। কারণ স্বর্ণের দাম কিছুটা হলেও ওঠানামা করে। সেইসাথে, এটি আবার কোনো সুদ বা নিয়মিত আয় দেয় না।

বাংলাদেশে সীমিত আয়ের মানুষদের কাছে সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়
বাংলাদেশে সীমিত আয়ের মানুষদের কাছে সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়

সঞ্চয়পত্র: রাষ্ট্রের নিশ্চয়তার ভরসা

বাংলাদেশের বেশিরভাগ ব্যাংকই এখন দুর্বল অবস্থায় আছে। তাই, বাংলাদেশে ব্যাংকে টাকা রাখতে অনেকে নিরাপদবোধ করছে না বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

তার মতে, স্বর্ণে বিনিয়োগের জন্য অন্যতম নিরাপদ জায়গা এখন এবং স্বর্ণের পর হলো সঞ্চয়পত্রের অবস্থান। “কারণ সঞ্চয়পত্র সরকারের কাছ থেকে আসে, তাই এটি নির্ভরযোগ্য।”

কিন্তু সেখানেও তো সীমা দেওয়া আছে। সবাই সঞ্চয়পত্র কিনলে সরকারকে তো সুদসহ সেগুলো ফেরত দিতে হবে, সঞ্চয়পত্রের সংকটের বিষয়ে বলছিলেন ফাহমিদা খাতুন।

সেজন্যই ২০২৬ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩০শে জুন পর্যন্ত সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়েছিলো সরকার। এতে সীমিত আয়ের বিনিয়োগকারীরা বিপাকে পড়ে যান। পরবর্তীতে ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরকার।

মূলত, নিরাপদ সঞ্চয় এবং মুনাফার হার বেশি থাকায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের একটি প্রচলিত খাত হল সঞ্চয়পত্র।

সঞ্চয়পত্র ইস্যু করে থাকে বাংলাদেশ সরকার, তাই মেয়াদ শেষে মুনাফাসহ বিনিয়োগকৃত টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে।

পাশাপাশি, এই খাতে নির্দিষ্ট হারে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর কমানোর সুযোগ রয়েছে।

কোথায় বিনিয়োগ করছেন তা ভালোভাবে না বুঝলে বিনিয়োগ না করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
কোথায় বিনিয়োগ করছেন তা ভালোভাবে না বুঝলে বিনিয়োগ না করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

কোনো করদাতার করযোগ্য বার্ষিক আয় যদি হয় ১০ লাখ টাকা, এর মধ্যে তিনি আয়ের ২০ শতাংশ বা দুই লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনলে তিনি তার প্রদেয় করের ওপর সর্বোচ্চ ছাড় পাবেন।

যে বছর বিনিয়োগ করবেন শুধুমাত্র ওই বছরেই তার উপর কর রেয়াত সুবিধা নিতে পারবেন।

তবে তিনি যে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করবেন তার অর্থ মেয়াদ পূর্তির আগে উত্তোলন করা যাবে না। সহজ করে বললে, যদি কেউ পাঁচ বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন, তাহলে সেটা মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভাঙানো যাবে না। ওই সময়ের আগে কেউ নগদায়ন করে ফেললে করদাতা যে টাকার কর রেয়াত সুবিধা নিয়েছিলেন, তা বাতিল হয়ে যাবে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীন যত ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্র। এতে সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে প্রায় ১২ শতাংশ মুনাফা মিলে। সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পেনশন সঞ্চয়পত্রেও প্রায় কাছাকাছি মুনাফা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে অবসরপ্রাপ্ত মানুষ, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর কাছে সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়।

এটা কেনা যাবে সকল সরকারি, বেসরকারি ব্যাংকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয়, ডাকঘর এবং সঞ্চয় ব্যুরো কার্যালয়ে।

অনেক ব্যাংক রয়েছে যারা সঞ্চয়পত্র করার সকল ঝামেলার কাজ, সুদের টাকা সরাসরি ব্যাংকে অ্যাকাউন্টে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জমির দামে রয়েছে পার্থক্য।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জমির দামে রয়েছে পার্থক্য

জমি ও আবাসন: দৃশ্যমান সম্পদের আকর্ষণ

দীর্ঘমেয়াদে জমির দাম সাধারণত কমে না, বরং বাড়তেই থাকে ‒ এই বিশ্বাস বহুদিনের।

ড. ফাহমিদা খাতুনও বলছিলেন, “জমি বা রিয়েল স্টেটে বিনিয়োগ করতে পারে। কারণ বাংলাদেশে মানুষ বেশি, জায়গা কম। এটাতে সবসময়ই ঊর্ধ্বমুখী এর দাম। একটা দেশের অর্থনীতি খারাপ হলেও জমির দাম কখনও কমে না সাধারণত।”

জমি কিংবা আবাসনে বিনিয়োগের একটি সামাজিক ও মানসিক দিকও আছে। অনেকের কাছে এটি শুধু বিনিয়োগ নয়, বরং নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতীক।

অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় দৃশ্যমান সম্পদে বিনিয়োগ মানুষকে মানসিক স্বস্তি দেয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, জমি বা রিয়েল এস্টেটের বড় ঝুঁকি হলো তারল্যের অভাব। কারণ জরুরি প্রয়োজনে এগুলো দ্রুত বিক্রি করা কঠিন।

আবার, বাজার স্থবির হলে দাম দীর্ঘদিন আটকে থাকতে পারে এবং শহরে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ফ্ল্যাট বা বাড়ি তৈরি হয়ে গেলে সেগুলো বিক্রি বা ভাড়া দিতেও সমস্যা হতে পারে।

এছাড়া, জমি কেনার আগে ভবিষ্যতে দাম বাড়বে এরকম জায়গা যদি নির্বাচন করা যায়, তাহলে আরও লাভ। আর জমিতে কোনো ঝামেলা আছে কিনা সেটি ভালো করে খবর নিয়ে দেখতে হবে। কোনো ভুয়া লোকের খপ্পরে পড়লেই বিপদ।

জমির মাটি উঁচু ভবন তৈরি করার মতো কি না, আশপাশে কোন স্থাপনার জন্য জমির দাম বাড়তে পারে কি না, জমির কাছে রাস্তা আছে কি না, ড্রেইনেজ সিস্টেম তৈরি হয়েছে কি না, এলাকাটি ভবিষ্যতে উন্নত হবে কি না – এসব যাচাই করেই জমি কেনা উচিৎ।

"যেকোনো ব্যাংকে" টাকা রাখা উচিৎ নয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা
যেকোনো ব্যাংকে” টাকা রাখা উচিৎ নয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা

ডিপিএস: ব্যাংকের ‘হেলথ’ বুঝে সিদ্ধান্ত

ডিপোজিট পেনশন স্কিমে মানুষ নিজের টাকা সঞ্চয় করেন, যার বিনিময়ে সুদ পান। কিছু ব্যাংক সাত থেকে সাড়ে সাত শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা দিয়ে থাকে।

এতে ব্যক্তি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য, যেমন – তিন, পাঁচ বা দশ বছরের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ জমা রাখবেন। নানা ব্যাংকে মাসে একশ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা দেয়া যায়।

কোনো কোনো ব্যাংক প্রতি মাসে সুদ দিয়ে থাকে, আবার কোনো ব্যাংক তিন মাস বা ছয় মাস অন্তর সুদ দেয়। এছাড়া, এককালীন ডিপিএস রয়েছে, যার সুদ মেয়াদ শেষে পাওয়া যায়।

সমস্যা হলো, ডিপিএসে সেভিংস অ্যাকাউন্টের মতো যখন তখন টাকা তোলা যাবে না।

ফাহমিদা খাতুন বলছিলেন, “ডিপিএস করা যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যাংকের হেলথ বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোন ব্যাংকে টাকাটা রাখা হচ্ছে, সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি বলছিলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোতে মুনাফা অনেকসময় কম থাকে। “কারণ সরকার নির্ভর হয়ে গেলে সরকারের ওপর চাপ পড়ে যায় তখন। সেজন্য সরকার ইন্টারেস্ট কমিয়ে দিতে চায়। তবে প্রাইভেট ব্যাংকে প্যাকেজ থাকে, সেগুলোর হেলথ দেখে বিনিয়োগ করতে হবে।”

তিনি আবার জোর দিয়ে বলেন, “যেকোনো ব্যাংকে” টাকা রাখা উচিৎ নয়। কারণ দেখা গেল যে ব্যাংক টাকাটা নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সে আর সময়মতো তা ফেরত দিতে পারছে না।

তাই, এক্ষেত্রে “ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি জরুরি” বলে মত মিজ খাতুনের।

সাধারণত বিভিন্ন মেয়াদে ও সুদে সরকার ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে থাকে
সাধারণত বিভিন্ন মেয়াদে ও সুদে সরকার ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে থাকে

সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও বিল: এখনও নিরাপদ

ফাহমিদা খাতুন বলছিলেন, “সরকারের ট্রেজারি বিল, এগুলো নিরাপদ।”

সাধারণত বিভিন্ন মেয়াদে ও সুদে সরকার ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এসব বন্ড নিলামে কেনা-বেচা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছর থেকে শুরু করে ২০ বছর পর্যন্ত মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড রয়েছে। এসব বন্ডে সুদের হার চার থেকে প্রায় আট শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে।

প্রতি ছয় মাস অন্তর মুনাফা তুলে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগের কোনো সীমা নেই।

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎস কর দিতে হয়। ট্রেজারি বন্ডে মুনাফা গ্রহণের সময় পাঁচ শতাংশ কর দিতে হয়।

ট্রেজারি বন্ড কেনা- বেচারও সুযোগ রয়েছে। বিক্রির সময় লাভে বিক্রি করা যায়।

এ বিষয়ে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরী বিবিসিকে বলেছিলেন, কোনো বিষয় না বুঝলে তাতে বিনিয়োগ না করাই ভালো।

“যেমন, ট্রেজারি বন্ড হয়ত সবার জন্য নয়। কারণ এটি নিলামের মাধ্যমে নিতে হয়, কেনার ঝামেলা আছে, এটি সবাই বুঝতে পারে না।”

অনেক সুদের লোভ দেখায় এমন অস্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে চলার পরামর্শ অর্থনীতিবদদের
অনেক সুদের লোভ দেখায় এমন অস্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে চলার পরামর্শ অর্থনীতিবদদের

শেষ কথা: নিরাপদ বিনিয়োগ বলে কিছু নেই

অর্থনীতিবিদরা একবাক্যে বলেন, “নিরাপদ বিনিয়োগ” একটি আপেক্ষিক ধারণা। যে খাত একজনের কাছে নিরাপদ, অন্যজনের জন্য তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সময়, লক্ষ্য, আয় ও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, সবকিছু মিলিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে অব্যবস্থার কারণে মানুষ বিকল্প খুঁজলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, আতঙ্কের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

যেমন, ফাহমিদা খাতুনের মতে, “জীবন বীমা সরকারের, কিন্তু এটা ডেভেলপড না আমাদের দেশে অতটা। এখান থেকে রিটার্ন অতটা ভালো আসে না। হ্যাঁ, কোনো বীমা বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক এককালীন এক লাখ টাকা দিবে, বাকিটাও দিবে, কিন্তু অনেক আস্তে আস্তে।”

তার মতে, “বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল প্রোডাক্টে অত অপশন নাই। অনেক দেশে বন্ড মার্কেট, ক্যাপিটাল মার্কেট থাকে। আমাদের সেই ডাইভারসিফিকেশন নাই। শেয়ার বাজার স্ট্রং না, শেয়ার বাজার ইজ নট আ অপশন। ভালো ইনভেস্টররাই এখানে আসে না।”

অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরীও বলেছিলেন, “শেয়ারবাজার বাংলাদেশে খুবই অস্বচ্ছ একটা জায়গা, বিভিন্ন গ্রুপ ইন্টারনাল ট্রেডিং-এর মাধ্যমে দাম ওঠা নামায় কারসাজি করে।”

“শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে গেলে এটা ভালো করে বুঝতে হয়। সঞ্চয়পত্রের মতো কিনে ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না। অতএব, এখানে বিনিয়োগে সাবধান হতে হবে। আমরা নানা সময়ে দেখেছি যারা শেয়ারবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারা স্বল্প পুঁজির মানুষ।”

এছাড়া, অনেক সুদের লোভ দেখায়, এমন অস্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে চলতেও বলেছিলেন তিনি।

বিবিসি বাংলা