ভারতের অর্থনীতির নতুন হিসাব প্রকাশের পর এক অদ্ভুত দ্বৈত চিত্র সামনে এসেছে। নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের আকার আগের ধারণার তুলনায় কিছুটা ছোট হয়েছে। তবে একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আগের হিসাবের চেয়েও দ্রুত গতিতে বাড়ছে। ফলে সামগ্রিকভাবে এই নতুন তথ্যকে একদিকে যেমন বাস্তবতার প্রতিফলন বলা হচ্ছে, অন্যদিকে এটিকে ভারতের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নতুন হিসাব, নতুন ভিত্তি
দীর্ঘদিন পর অর্থনীতির হিসাবের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন পদ্ধতিতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের গুরুত্ব নির্ধারণের ভিত্তিবছর নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২২ সাল। একই সঙ্গে আরও বিস্তৃত তথ্যসূত্র যুক্ত করা হয়েছে, যাতে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্র আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।
এই পরিবর্তনের ফলে দেখা যাচ্ছে, ভারতের অর্থনীতি আগের তুলনায় কিছুটা বেশি গ্রামীণমুখী। কৃষি খাতের অবদান এখন মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৮ শতাংশ। বিশেষ করে মাছচাষ ও দুগ্ধ উৎপাদনের বিস্তারিত তথ্য যুক্ত হওয়ায় কৃষি খাতের আকার আরও বড় হয়ে দেখা যাচ্ছে।
সেবা খাতের হিসাব বদল
নতুন পদ্ধতিতে সেবা খাতের হিসাবেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। অর্থনীতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আর্থিক ও ব্যবসায়িক সেবা খাতের উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। তবে বাণিজ্য, হোটেল ও পরিবহন খাতের হিসাব আগের তুলনায় কম ধরা হয়েছে।
এর ফলে সেবা খাতের মোট আকার আগের হিসাবের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কম দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে এই খাত দেশের মোট অর্থনীতির প্রায় ৪১ শতাংশ জুড়ে রয়েছে।
অন্যদিকে উৎপাদন খাতের অংশও সামান্য কমে প্রায় ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
প্রবৃদ্ধি আরও দ্রুত
অর্থনীতির আকার কিছুটা ছোট দেখা গেলেও প্রবৃদ্ধির গতি কিন্তু বেড়েছে। নতুন হিসাব অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের অর্থনীতি বেড়েছে ৭.১ শতাংশ। আগে এই প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ৬.৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং ইলেকট্রনিক পণ্য সংযোজন শিল্প প্রবৃদ্ধিকে নতুন গতি দিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব কর ও নিয়ন্ত্রক সংস্কারের প্রভাবও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
যদিও সরকারের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল উৎপাদন খাতকে মোট অর্থনীতির এক চতুর্থাংশে নিয়ে যাওয়া, সেই লক্ষ্য এখনও পূরণ হয়নি।
পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা
নতুন পরিসংখ্যান প্রকাশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা। গত এক দশকে অর্থনৈতিক তথ্য নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল। বিশেষ করে গ্রামীণ ভোগ কমে যাওয়ার একটি জরিপ প্রকাশ না হওয়ায় অনেকেই সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তবে নতুন হিসাবের ফলে অর্থনীতির কিছু দুর্বল দিকও সামনে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশে অস্বস্তিকর বাস্তবতাও লুকিয়ে রাখা হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে নতুন হিসাব ভারতের অর্থনীতিকে কিছুটা ছোট দেখালেও প্রবৃদ্ধির গতি যে শক্তিশালী রয়েছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় বার্তা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















