পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছরের শাসন শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন ঘটিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এই জয় শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং পুরো রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত এক সুপরিকল্পিত কৌশলের ফল। উত্তরবঙ্গের শক্ত ঘাঁটি ধরে রাখার পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গেও তারা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, এমনকি প্রেসিডেন্সি বিভাগের মতো দীর্ঘদিনের তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটিতেও।
একই সঙ্গে জঙ্গলমহলের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাতেও বিজেপি তাদের প্রভাব পুনরুদ্ধার করেছে। তিনটি ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুকে সামনে রেখে প্রচারণা চালানোই তাদের এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হয়ে ওঠে।

দক্ষিণবঙ্গ: তৃণমূলের ঘাঁটিতে ধাক্কা
প্রেসিডেন্সি বিভাগ, যার মধ্যে কলকাতা, হাওড়া, নদিয়া ও দুই ২৪ পরগনা অন্তর্ভুক্ত, দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানেই রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
এই অঞ্চলে বিজেপির উত্থানের পেছনে তিনটি বড় কারণ কাজ করেছে—শাসকবিরোধী মনোভাব, হিন্দু ভোটের সংহতি এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘গুণ্ডাগিরি’র অভিযোগ। এসব ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি উল্লেখযোগ্য আসনে এগিয়ে যায়।
কলকাতার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনেও তারা সাফল্য পায়। উত্তর ২৪ পরগনায় বিজেপি তৃণমূলকে ছাড়িয়ে যায় এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার কয়েকটি আসনেও এগিয়ে থাকে। পাশাপাশি বীরভূম, হুগলি ও পূর্ব মেদিনীপুরেও তারা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে।
উত্তরবঙ্গ: পুরোনো ঘাঁটি ধরে রাখা
উত্তরবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহারসহ বিভিন্ন জেলায় তারা ভালো ফল ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এখানে গোরখাল্যান্ড ইস্যুর স্থায়ী সমাধানের প্রতিশ্রুতি, চা-বাগান শ্রমিকদের সমস্যা এবং রাজবংশী সম্প্রদায়ের সমর্থন বিজেপির পক্ষে যায়। চা বাগানের কম মজুরি ও বন্ধ বাগানের বিষয়গুলোও তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ায়।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই উত্তরবঙ্গে বিজেপির পুনরুত্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, যা এই নির্বাচনে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জঙ্গলমহল: আদিবাসী এলাকায় প্রত্যাবর্তন
দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গলমহল অঞ্চলে বিজেপি আবারও তাদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের বেশিরভাগ আসনেই তারা এগিয়ে থাকে।
এই অঞ্চলে মূলত উন্নয়নসংক্রান্ত ইস্যু—বিশেষ করে আবাসন ও পানীয় জলের সংকট—ভোটারদের প্রভাবিত করেছে। পাশাপাশি আলু উৎপাদনের অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম কমে যাওয়াও স্থানীয় অসন্তোষ বাড়িয়েছে।
আদিবাসী ও কুর্মি সম্প্রদায়ের সমর্থন অর্জনে বিজেপি সফল হয়। কুর্মালি ভাষাকে জাতীয় ভাষার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সমগ্র চিত্র
রাজ্যজুড়ে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে বিজেপি এই জয় নিশ্চিত করেছে। দক্ষিণবঙ্গে শাসকবিরোধী মনোভাব, উত্তরবঙ্গে আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু এবং জঙ্গলমহলে উন্নয়ন ও সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনীতি—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত কৌশলই তাদের সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















