শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে নিজের ‘ঝালমুড়ি’ খাওয়ার সুযোগ পেয়েই গেলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চেষ্টা, বিশেষ করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ব্যর্থতার পর এবার অনেক বেশি পরিকল্পিত কৌশল নিয়ে মাঠে নামে মোদি–অমিত শাহ জুটি।
ভারতীয় জনতা পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পূর্ণ শক্তি কাজে লাগিয়ে এবং নির্বাচনী কাঠামোয় সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা এমন এক সাফল্য পায়, যা এতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবেই বিবেচিত ছিল।
মমতার পতনের পেছনে শুধু তাৎক্ষণিক কিছু ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক ক্লান্তিও বড় ভূমিকা রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ক্রমশ জনমনে ক্ষোভ তৈরি করছিল। এই অভিযোগগুলো বারবার সামনে আসায় মমতার রাজনৈতিক নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে এক তরুণী চিকিৎসক হত্যার ঘটনায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শহর ও শহরতলিতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। দীর্ঘদিন ধরে নারীদের জন্য নিরাপদ শহর হিসেবে পরিচিত কলকাতার ভাবমূর্তিও এতে বড় ধাক্কা খায়। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এতে অংশ নেয়, যা রাজপথের রাজনীতিকে নতুন করে উজ্জীবিত করে এবং সরকারকে চাপে ফেলে।
তাৎক্ষণিক ঘটনাগুলোর পাশাপাশি আরও গভীরে ছিল অর্থনৈতিক হতাশা। একসময় ভারতের শিল্পকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষ করে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে, পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে শিল্পহীনতার দিকে এগিয়ে যায়। পাট, বস্ত্র, লোহা-ইস্পাতসহ ঐতিহ্যবাহী শিল্প খাতগুলোর পতন, নীতিগত ভুল এবং পুঁজি অন্যত্র সরে যাওয়ায় কর্মসংস্থান কমে যায় এবং অর্থনীতির ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই অবস্থার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যদিও বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা ছিল, বড় ধরনের শিল্পায়ন হয়নি এবং প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান তার সমর্থনভিত্তিকে ক্ষয় করে।
নির্বাচনের সমীকরণ আরও জটিল হয় সামাজিক ভিত্তির পরিবর্তনে। একসময় বামফ্রন্ট এবং পরে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন দেখা যায়। একাংশ তৃণমূলের সঙ্গে থাকলেও অন্য অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ে, কারণ তাদের দাবি-দাওয়া যথাযথভাবে পূরণ হয়নি বলে ধারণা তৈরি হয়।

এর পাশাপাশি নির্বাচনী তালিকার বিশেষ পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। প্রায় ৯৪ লাখ নাম, যা মোট ভোটারের প্রায় এক-দশমাংশ, বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিজেপির দাবি ছিল, ভুয়া বা ডুপ্লিকেট নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রায় ৩৭ লাখ মানুষ, যাদের অনেকেই সংখ্যালঘু, নারী এবং আর্থিকভাবে দুর্বল গোষ্ঠীর, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। শেষ পর্যন্ত অনেকের নাম ফেরত না আসায় ভোটের ফলাফলে এর প্রভাব পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতাচ্যুতির পর এখন বড় প্রশ্ন—এর পর কী? পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বরাবরই সামাজিক দ্বন্দ্ব এবং জমির প্রশ্নকে কেন্দ্র করে সংঘাতপূর্ণ। তার সমর্থকদের অসন্তোষ কি সহিংসতার রূপ নেবে, নাকি তিনি নতুন করে সংগঠিত হয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার দিকে মনোযোগ দেবেন?
সবকিছু নির্ভর করছে তার সংগঠন কতটা অটুট থাকে তার ওপর। অনেকেই নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র বিজেপির দিকে ঝুঁকতে পারেন। তবে আবার অনেকে রয়েছেন, যারা এখনও তার নেতৃত্বে আস্থা রাখেন এবং তার সঙ্গেই থাকবেন। এই সমর্থকদের নিয়েই তিনি নতুন রাজনৈতিক লড়াই গড়ে তুলতে পারেন, যা শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সারা দেশের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















