আসামে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা শুধু রাজ্যের রাজনীতিতেই নয়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিজেপির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছেন। দলের ভেতরে ও বাইরে—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
রাজনীতিতে উত্থানের গল্প
২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই হিমন্ত বিশ্ব শর্মার রাজনৈতিক যাত্রা নতুন মোড় নেয়। তার আগেই তিনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে ছাত্রনেতা থেকে প্রভাবশালী মন্ত্রীতে পরিণত হয়েছিলেন। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার এক বছরের মধ্যেই দলটি অসমে ক্ষমতায় আসে এবং তিনি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। এরপর ২০২১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে নিজের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পূরণ করেন।

কঠোর নীতি ও উন্নয়ন—দুইয়ের মিশ্রণ
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে গত পাঁচ বছরে শর্মা একদিকে কঠোর হিন্দুত্ববাদী অবস্থান নিয়েছেন, অন্যদিকে উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিয়েছেন। বিশেষ করে ‘ওরুণোদয়’ প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং তাঁতশিল্পীদের জন্য ‘স্বনির্ভর নারী’ কর্মসূচি চালু করা তাঁর সরকারের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। পাশাপাশি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সেতু, সড়ক ও হোস্টেল নির্মাণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিতর্ক ও সমালোচনা
তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে ‘মিয়া’ সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে দেওয়া বক্তব্য এবং উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বিরোধীরা তাঁকে বিভাজনমূলক রাজনীতির অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সীমা পুনর্বিন্যাসের ফলে মুসলিম ভোটারদের প্রভাব কমে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
উত্তর-পূর্বে বিজেপির বিস্তারে ভূমিকা
শুধু অসমেই নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও বিজেপির প্রভাব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন শর্মা। ত্রিপুরা ও মণিপুরে সরকার গঠনে তাঁর কৌশলগত ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ে দলের অবস্থান শক্ত করতে আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে তিনি সক্রিয় ছিলেন।

নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে
নতুন মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার সম্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে শর্মার সামনে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে ইউনিফর্ম সিভিল কোড বাস্তবায়ন, অবৈধ অভিবাসী ইস্যু সমাধান, এবং ‘লাভ জিহাদ’ ও ‘ল্যান্ড জিহাদ’ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে—যা সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিও কম নয়। প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ, নারীদের আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, ৪০ লাখ নারীকে স্বনির্ভর করা এবং বন্যামুক্ত অসম গড়ে তোলার মতো বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যের ঋণভারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে আসছে।
জনপ্রিয়তা ও প্রশাসনিক দক্ষতা
সমালোচনা সত্ত্বেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কার্যকরভাবে নীতি বাস্তবায়নের দক্ষতা শর্মাকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। তাঁর সমর্থকরা তাঁকে উত্তর-পূর্বের ‘অমিত শাহ’ বলেও আখ্যা দিয়ে থাকেন।
পরবর্তী সময়ে এই জনপ্রিয়তা ও প্রশাসনিক দক্ষতা তাঁকে জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা সহায়তা করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আসামে টানা তৃতীয় জয়ের পর হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে বিজেপির ভবিষ্যৎ পথচলা তাই নতুন প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ—দুইয়ের সমন্বয়ে এগোচ্ছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















