পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফলে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা সামনে এসেছে—১৮৭টি আসনের মধ্যে অন্তত ৪৭টিতে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা জয়ের ব্যবধান বা লিডের চেয়েও বেশি। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভোটার বাদ পড়ার ঘটনাই বহু ক্ষেত্রে ফলাফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে, যা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়া ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করছে।
কোথায় সবচেয়ে বড় প্রভাব
নির্বাচনী তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যেসব ১৮৭টি আসনে ৫ হাজারের বেশি ভোটার নাম বাদ পড়েছে, সেখানে ফলাফলের চিত্র জটিল। এসব আসনের মধ্যে বিজেপি ১১৯টিতে জয় বা এগিয়ে রয়েছে, আর তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) জিতেছে বা এগিয়ে রয়েছে ৬৫টিতে। বাকি কয়েকটি আসনে অন্যান্য দলও সাফল্য পেয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ১৮৭টি আসনের মধ্যে অন্তত ৪৭টিতে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই বাদ পড়া ভোটাররা থাকলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত কি না।

দলভিত্তিক চিত্র
বিজেপি যে ১১৯টি আসনে এগিয়ে বা জয়ী হয়েছে, তার মধ্যে ২৮টি আসনে ভোটার বাদ পড়ার সংখ্যা তাদের জয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই ২৮টির মধ্যে ২০২১ সালের নির্বাচনে ২৬টি আসনই জিতেছিল টিএমসি।
অন্যদিকে, টিএমসি যে ৬৫টি আসনে জয় বা এগিয়ে রয়েছে, তার মধ্যে ১৮টি আসনে ভোটার বাদ পড়ার সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়ে গেছে। এই তালিকায় কংগ্রেস ২টি আসনে জয় পেয়েছে এবং একটি আসনে অন্য একটি দল জিতেছে।
সর্বাধিক বাদ পড়া ২০ আসনের চিত্র
যেসব ২০টি আসনে সবচেয়ে বেশি ভোটার নাম বাদ পড়েছে, তার মধ্যে ১৩টিতে জয় পেয়েছে টিএমসি, ৬টিতে বিজেপি এবং ১টিতে কংগ্রেস। সামশেরগঞ্জ, লালগোলা, ভগবানগোলা, রঘুনাথগঞ্জ, মেটিয়াবুরুজ, সুতি, মোথাবাড়ি, গোলপোখর, মালতিপুর, চোপড়া, সুজাপুর, রাজারহাট নিউ টাউন ও বসিরহাট উত্তরের মতো আসনে টিএমসি জয় পেয়েছে।
অন্যদিকে, জঙ্গিপুর, রাতুয়া, করনদিঘি, কেতুগ্রাম, মানিকচক ও মন্তেশ্বরে বিজেপি জয়ী হয়েছে এবং ফারাক্কায় জয় পেয়েছে কংগ্রেস।

এসআইআর প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য
দেশজুড়ে গত বছরের জুনে শুরু হওয়া এসআইআর প্রক্রিয়া সাধারণ সংশোধনের তুলনায় অনেক কঠোর ছিল। এতে তালিকাভুক্ত প্রত্যেক ভোটারকে নতুন করে তথ্য জমা দিতে এবং নাগরিকত্বসহ যোগ্যতার প্রমাণ দিতে বলা হয়।
পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়ায় একাধিক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বিচারিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ভোটারদের যোগ্যতা নির্ধারণ।
চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, প্রায় ৬০.০৬ লক্ষ ভোটারকে যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়, যা মোট ভোটারের প্রায় ৮.৫ শতাংশ। পরে প্রায় ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে। এদের মধ্যে অনেকেই আপিল করেছেন, যা এখনো বিচারাধীন।
বিতর্ক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং এটি সরাসরি নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেখানে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে এই প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বঙ্গের এই ফলাফল তাই একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—ভোটার তালিকা সংশোধন কি শুধুই প্রক্রিয়াগত, নাকি এটি নির্বাচনের গতিপথও নির্ধারণ করছে।

#WestBengal #SIR #VoterList #Election2026 #TMC #BJP #Congress #IndianPolitics
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















