মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মাঝেও দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে আলাদা এক নিরাপদ ও সমৃদ্ধ শহর হিসেবে তুলে ধরেছিল দুবাই। ধনী বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এবং পর্যটকদের জন্য এটি ছিল এক আকর্ষণীয় গন্তব্য—যেখানে মানুষ আসত কাজ করতে, অর্থ উপার্জন করতে কিংবা বিলাসবহুল জীবন উপভোগ করতে। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই নিরাপত্তার ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
যুদ্ধের আগুনে কেঁপে উঠল দুবাই
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা আক্রমণ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। যুদ্ধের প্রথম দিনেই দুবাইয়ের কৃত্রিম দ্বীপ পাম জুমেইরাহ অঞ্চলের একটি বিলাসবহুল হোটেলে আগুন লাগে। একই সময়ে একটি বড় তথ্যকেন্দ্রেও আগুন ধরে যায়।
শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাময়িকভাবে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ করতে হয়। এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র এবং দুবাইয়ের পর্যটন শিল্পের প্রধান ভিত্তি। পাশাপাশি জেবেল আলি বন্দরেও অস্থায়ীভাবে কার্যক্রম থেমে যায়। অনেক এলাকায় বাসিন্দাদের বাড়ির আঙিনায় ধ্বংসাবশেষ পড়তে দেখা যায়।
এই ঘটনাগুলো দুবাইয়ের দীর্ঘদিনের নিরাপদ শহরের ভাবমূর্তিকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
মানুষ ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অনেক বিদেশি বাসিন্দা এখনো শহর ছেড়ে যাননি। কিন্তু কেউ কেউ সাময়িকভাবে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন। অনেকেই ওমান কিংবা সৌদি আরব হয়ে অন্যত্র যাওয়ার পথ খুঁজছেন, কারণ সেখানে আকাশপথ এখনো খোলা রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ব্যবসায়ী ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত অবস্থান ধরে রাখলেও বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করতে শুরু করেছে।
দুবাইয়ের অর্থনৈতিক উত্থানের মূল শক্তি ছিল বিদেশি জনশক্তি ও বৈশ্বিক বিনিয়োগ। এখন প্রশ্ন উঠেছে—এই মানুষ ও অর্থ আগের মতোই কি আসতে থাকবে?
জনসংখ্যা ও সম্পদের দ্রুত বৃদ্ধি
গত কয়েক বছরে বিদেশিদের আকর্ষণ করতে দুবাই দীর্ঘমেয়াদি ভিসা চালু করেছে এবং বিদেশিদের জন্য বাড়ি কেনা সহজ করেছে। এর ফলে শহরের জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। গত বছর জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ লাখে, যা কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি।
ধনী ব্যক্তিদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং তাদের সেবা দিতে বহু প্রতিষ্ঠানও এখানে কার্যক্রম শুরু করেছে। আর্থিক খাতেও দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে।
২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই দুবাইয়ের আর্থিক কেন্দ্রে এক হাজারের বেশি নতুন প্রতিষ্ঠান ব্যবসা শুরু করেছে। বিশ্বের বড় বড় ব্যাংকও তাদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বড় বিনিয়োগ
দুবাই এখন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতেও বড় বিনিয়োগ করছে। শহরে একাধিক বড় তথ্যকেন্দ্র রয়েছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের তথ্যকেন্দ্র বিনিয়োগের বড় অংশই এই দেশে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার চেষ্টা করছে আমিরাত।
কিন্তু যুদ্ধের ঝুঁকি এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে শুরু করেছে। আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুদ্ধজনিত ঝুঁকি নিয়ে খুব বেশি ভাবেনি অনেক কোম্পানি। এখন তারা রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার জন্য বিশেষ বীমা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
বিকল্প শহরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা
যদি কোনো প্রতিষ্ঠান দুবাই ছাড়ার কথা ভাবে, তাহলে তাদের অন্য শহর বেছে নিতে হবে। মহামারির সময় হংকং বা সিঙ্গাপুরের চাপ এড়িয়ে অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুবাইয়ে এসেছিল।
এখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেলে তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফলে ব্যবসা ধরে রাখতে দুবাই প্রশাসনকে দ্রুত আস্থা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
আস্থা ফেরাতে চেষ্টা করছে প্রশাসন
দুবাইয়ের শাসকগোষ্ঠী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে এবং শহরে বড় ধরনের আতঙ্ক ছড়ায়নি।
বড় সুপারমার্কেটগুলো জানিয়েছে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। জেবেল আলি বন্দর দ্রুত আবার চালু করা হয়েছে।
শহরের জনপ্রিয় শপিং কেন্দ্রেও স্বাভাবিক পরিবেশ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এতে বোঝানো হয়েছে যে শহর এখনো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
দুবাইয়ের সামনে বড় পরীক্ষা
তবুও বাস্তবতা হলো—শহরের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের শব্দ, যুদ্ধবিমানের গর্জন এবং ধোঁয়ার মেঘ এখন আর অচেনা দৃশ্য নয়। বিলাসিতা ও ঝলমলে জীবনের জন্য পরিচিত এই শহরে এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতাও অনুভূত হচ্ছে।
সংকটের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার জন্য দুবাই পরিচিত। এখন বড় প্রশ্ন হলো—ব্যবসা, বিনিয়োগকারী ও বাসিন্দাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে তারা কত দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে।
কারণ যুদ্ধের অনেক দিকই শহরের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আর সেই অনিশ্চয়তার মাঝেই দুবাইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে বিশ্ব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















